২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৬ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ৮:১৮

দুর্গম চরের ঘরে ঘরে সৌরালোক

 

ডেস্ক নিউজ : সন্ধ্যা নামতেই ঘরে আলো জ্বালাতে হয় আয়েশা বেগমের। আছে বাড়ির প্রাত্যহিক কাজকর্ম; আবার ছেলেমেয়ের পড়াশোনা। এ ক্ষেত্রে ভরসা ছিল কেবল কেরোসিনের কুপিবাতি কিংবা হারিকেন। কারণ, এ তল্লাটে কোনো বিদ্যুৎ ছিল না।

তবে এখন আর কুপিবাতি বা হারিকেনের আলোয় চলতে হয় না পটুয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ-জনপদ চরবিশ্বাসের এ গৃহবধূকে। তাঁর ঘর আলোকিত করছে সৌরবিদ্যুতের আলো। এ চরে বসানো সৌরবিদ্যুতের ‘মিনি গ্রিড’ থেকে বিদ্যুৎ আসছে এ বাড়িতে।

যারপরনাই খুশি আয়েশা বেগম বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ পেয়ে আমাদের চেয়ে বেশি খুশি হয়েছে ছেলেমেয়েরা। এখন তারা বিদ্যুতের আলোয় স্বচ্ছন্দে লেখাপড়া করতে পারছে।’

পটুয়াখালীর গলাচিপার বুড়িগৌরাঙ্গা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনার জেগে ওঠা দ্বীপ ইউনিয়ন চরবিশ্বাস। উপজেলা শহর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এ চরে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ-সুবিধা পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। অবস্থাসম্পন্ন হাতেগোনা কিছু বাড়িতে নিজস্ব সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু সেখানকার লক্ষাধিক বাসিন্দার রাতটা কাটে প্রায় অন্ধকারে।

তবে চরবিশ্বাস ইউনিয়নের উত্তর চরবিশ্বাস গ্রামে চলতি বছর সৌরবিদ্যুতের ১০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার ‘মিনি গ্রিড’ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। গত আগস্ট মাসের মাঝামাঝি পরীক্ষামূলকভাবে এই কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদনে আসে। সেখান থেকে এখন প্রান্তিক এলাকার দোকানপাট, বাসা-বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনায় পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়েছে। এই সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন করেছে সরকারি সংস্থা ইডকলের (ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড)। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে গ্রীন হাউজিং অ্যান্ড এনার্জি লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা।

চলতি মাসের (নভেম্বর) মাঝামাঝিতে সরেজমিনে দেখা যায়, চরবিশ্বাস বাজারের প্রবেশের মুখেই সড়কের পাশে  বসানো হচ্ছে বিদ্যুতের খুঁটি। বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য টানানো হচ্ছে বিদ্যুতের তার। ডান দিকে তাকালেই চোখে পড়ে ইডকলের কার্যালয়। কার্যালয়ের ভেতরে একটি কক্ষে সারি সারি ব্যাটারি। এসব ব্যাটারিতে সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণ করা হয়।

গ্রীন হাউজিংয়ের বরিশাল বিভাগীয় ব্যবস্থাপক আবুল হোসেন বলেন, চরবিশ্বাস ইউনিয়নে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ দেওয়ার বিষয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। কিন্তু দুর্গম এ চরে সেই বিদ্যুৎ পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ফলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে চরবিশ্বাস বাজারে তিন কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন রয়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি বসিয়ে আরও এক কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালনের তার টানানো হচ্ছে।

দাম বেশি

গ্রীন হাউজিং সূত্রে জানা যায়, এই মিনি গ্রিড থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ যাচ্ছে মোট ৬০ জন গ্রাহকের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে। তাঁদের মধ্যে ৪৫ জন ব্যবসায়ী ও বাকি ১৫ জন বাসাবাড়ির গ্রাহক। গ্রাহকসংখ্যা ৩২০ জনে উন্নীত করতে চায় তারা।

বর্তমানে এই কেন্দ্র থেকে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। আর প্রাকৃতিক কোনো কারণে সৌরবিদ্যুতের সমস্যা হলে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর আছে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ধরা হয়েছে ৩০ টাকা। এর বাইরে সংযোগের জন্য অফেরতযোগ্য তিন হাজার টাকা দিতে হয়।

চরবাসী বলছেন, সৌরবিদ্যুতের আলো চরের দীর্ঘদিনের ঘুটঘুটে অন্ধকার দূর করেছে, এ কারণে তাঁরা আনন্দিত। কিন্তু বিদ্যুতের যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অনেকে বেশি। দাম নিয়ে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।

চরবিশ্বাস বাজারের জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুবকর বলেন, ‘আমাদের এই বিচ্ছিন্ন চরে বিদ্যুতে আলোকিত হবে, তা ভাবতেও পারিনি। তবে এখানকার মানুষের কাছ থেকে বিদ্যুতের যে দাম নেওয়া হচ্ছে, তা অতিরিক্ত।’

চরবিশ্বাস ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোফাজ্জেল হোসেন বাবুল মুন্সিবলেন, বিচ্ছিন্ন চরে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, এটি খুশির বিষয়। কিন্তু বিদ্যুতের যে দাম ধরা হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে। তাই দাম কমানো দরকার।

গৃহবধূ আয়েশা বেগম ওই চার ঘণ্টায় (সন্ধ্যা ৬টা-রাত ১০টা) দুটি বাতি ও একটি ফ্যান চালান। এতেই প্রতি মাসে তাঁর বিল আসছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এটা তাঁদের মতো সীমিত আয়ের পরিবারের জন্য একটু বেশিই হয়ে হচ্ছে।

জানতে চাইলে গ্রীন হাউজিং অ্যান্ড এনার্জি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশতাক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসলে আমরা দাম নির্ধারণ করিনি। সরকারের পক্ষ থেকে দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, একই ভূখণ্ডের চরকাজলে এখন অপর একটি ১০০ ওয়াট ক্ষমতার ‘মিনি গ্রিড’ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে। দুই মাসের মধ্যে সেখানেও বিদ্যুৎ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

 

 

 

 

 

 

কিউএনবি/রেশমা/২রা ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং/সকাল ১০:৩০