১৪ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩০শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ৬:২৯

সহিংসতার বর্ণনা কোরআনের চেয়ে বাইবেলে বেশি

ইসলাম ধর্ম বিশ্বাসীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন। ঐশ্বরিক এ গ্রন্থ ইসলাম ধর্মের প্রবক্তা ও মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃত হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা.) উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। এ ইতিহাস বেশি দিনের নয়। ১৫শ’ বছর আগের। বর্তমান বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ বা ২৩ শতাংশ মানুষ এ ধর্মগ্রন্থের অনুসারী। তাদের বিশ্বাস এই যে, বিপদগামী মানব সম্প্রদায়কে হেদায়েতে পবিত্র এ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছিলেন সৃষ্টিকর্তা। মানবজাতির জীবনবিধান হিসেবেও কোরআনকে বিবেচনা করেন মুসলমানরা।

অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে এ ধর্মগ্রন্থ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এ চেষ্টা অব্যাহত আছে এখনও।  চলবে হয়তোবা অনাগত সময়েও। আলোচনা-সমালোচনার এ ধারা নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয় কারো। তবে আপত্তি উঠেছে সমালোচকদের কুটিল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।

মানব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা সর্বশেষ ধর্মমত ইসলাম ও এ ধর্মের প্রবক্তাকে হেয় প্রতিপন্ন করা সমালোচনার প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে উঠছে দিনে দিনে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামবিরোধী সমালোচনায় জনপ্রিয় সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য সৃষ্টিসহ সামাজিক নানা সমস্যর উৎস হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনকে। ফেসবুক পেজ পেগিডায় জোরালোভাবে এ বক্তব্য তুলে ধরে বলা হচ্ছে, ‘কোরআন পড়ে কেউ কেউ এটির বাণী প্রত্যাখ্যান করলেও অনেকে এ ধর্মগ্রন্থের উগ্রপন্থার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।’

পেগিডা ইসলাম বিদ্বেষী একটি ফেসবুক পেজ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় এ পেজে ধারাবহিকভাবে ইসলাম ধর্ম ও এ ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ কোরআনকে নিয়ে কটাক্ষ করে বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে। বাদ থাকছে না এ ধর্মের প্রবতর্ক ও ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানব হযরত মোহাম্মদও (সা.)।

পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার আগে মানব সম্প্রদায়ের জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল আরো তিন তিনটি ধর্মগ্রন্থ। সেগুলো হলো পবিত্র ধর্মগ্রন্থ তাওরাত, যাবুর ও ইঞ্জিল। সব ধর্মগ্রন্থেই সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে মানব সম্প্রদায়কে সত্য ও সুন্দরের পথে ফেরার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এর আগে অবতীর্ণ ধর্মগ্রন্থ সামাজিক যোগাযোগ পেগিডা ফেসবুকে সব লেখায় বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস ও সহিংসতার জন্য দায়ী করা হচ্ছে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনকে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে বর্তমান বিশ্বের সব সহিংসতার জন্য সত্যিই কি কোরআন দায়ী। না কি এ প্রচারণা উদ্দশ্যমূলক। বাইবেল এবং তাওরাতের চেয়ে বেশিমাত্রায় সহিংসতার কথা উল্লেখ রয়েছে মুসলামানদের এ ধর্মগ্রন্থে?

উলফ ইনস্টিটিউটের আন্তঃধর্মীয় সংস্থার প্রধান নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ইডি কেসলার এ ধরনের বক্তব্য নাকচ করে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদ মাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘কোরআনের মতো একই ধরনের বক্তব্য রয়েছে আগের সব ধর্মগ্রন্থেও। এ ধর্ম গবেষক বলেন, ‘আপনাকে কোরআন পড়তে হবে এ গ্রন্থের যথাযথ তাৎপর্য বুঝে।’

পবিত্র বাইবেলের উল্লেখযোগ্য স্তবকে যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির জন্য ইহুদিদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে নানা ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। রক্তক্ষয়ী দীর্ঘ যুদ্ধে জয়ী হয় ব্যাবিলনিয়রা। স্তবকের নানা বর্ণনায় বিশদ ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে সহিংসতা নিয়ে। বাইবেলের নতুন ও পুরাতন টেস্টামেন্ট পড়লেও দেখা যাবে নানারকম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সহিংসতার বর্ণনা। রক্তাক্ত ও সহিংসতার বর্ণনা শুধু কোরআনে নয় বাইবেলজুড়েও আছে। সেগুলোর উল্লেখ না করে পেগিডা ফেসবুকে সহিংসতার সব দায় পবিত্র কোরআনের বর্ণনার ওপর চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে।

নিষ্ঠুর বা হিংসাত্মক ঘটনার বর্ণনা যেখানে বাইবেলে ৮৪২ বার উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে কোরানে মাত্র ৩৩৩ বার। এই বিষয়ে ডক্টর কেসলার আরো বলেন, ‘তিন ধরণের আব্রাহামিক ধর্মেও আমরা একই দৃশ্য দেখতে পাই। কিন্তু আপনাকে এইসব ব্যাখ্যা পড়তে হবে আধুনিক সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যম দিয়ে। কোরআন যদি সহিংসতার নির্যাস হয় তাহলে বাইবেল হবে সহিংসতার বীজ। আর এজন্য আপনাকে অবশ্যই বাইবেলের নতুন ও পুরাতন টেস্টামেন্ট পড়তে হবে। যেখানে কোরআনের চেয়ে অধিক পরিমাণ সহিংসতা ও রক্তক্ষয়ী দৃশ্যপটের উল্লেখ রয়েছে।

ডক্টর কেসলার বলেন, ‘একটি বই কখনো কোনো প্রকার সহিংসতার কারণ হতে পারে না। আমরা নিজেরাই ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে যত রকম সমস্যার সৃষ্টি করি।’

আইএস এবং অন্যান্য সালাফিস্ট গোষ্ঠী নানারকম কার্যকলাপ করে থাকে এবং তাদের নানারকম প্রোপাগান্ডা চালায় ইসলামকে কেন্দ্রে করে। যেখানে ইসলামে সবসময় সত্য অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে পাশাপাশি অন্য ধর্মগ্রন্থগুলোতেও একই কথা পাওয়া যায়। সব ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে হিংসা ও সহিংসতার পথ থেকে সরে এসে সত্য অনুসন্ধানের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীতে শান্তি বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে।

ডক্টর কেসলার বলেন, ‘আজকের এ সময়ে ধর্মীয় গ্রন্থগুলোর এমন সব ব্যাখ্যা দেয়া হয় যা আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রাসঙ্গিক এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। ব্যাখ্যায় সাধারণত ব্যবহার করা হয়ে থাকে ভালো অথবা মন্দ অথবা মৌলবাদ বা মুক্তচিন্তা।এখন এটা নির্ভর করে পাঠকের উপর যে, কে কিভাবে তা গ্রহণ করবে।’

তিনি বলেন, ‘গত ১৫ বছরে ইসলামকে কেন্দ্র করে নানারকম রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি হয়েছে যা আদৌ বাইবেলকে কেন্দ্র করে আমরা হতে দেখিনি।’

ক্যামব্রিজের এক সহকর্মী বলেছেন ‘ব্রিটিশ মুসলিম গোষ্ঠীগুলো মৌলবাদী ব্যাখ্যা দিয়ে কোরআনকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। ইসলামিক অনেক গোষ্ঠী নিজেরা ইসলামকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে সবার সামনে উপস্থাপন করছে। আর সে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিট্রিশ ফাস্ট এবং পেগিডার মতো বিভিন্ন ইসলাম বিরোধী ফেসবুক পেজগুলো ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইসলামোফোবিয়া সৃষ্টি করছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের বহুল প্রচলিত একটি পত্রিকার একজন নিয়মিত লেখিকা মারিয়া হাকিম বলেন, ‘কোরআনের স্তবকগুলো আমরা ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে উদ্ধৃতি দিয়ে থাকি। অথচ পবিত্র কোরআনে ধর্ষণ, যৌন দাসত্বকে কখনোই গ্রহণযোগ্যতা দেয়া হয়নি। তিনি তার লেখায় উল্লেখ করেন নিরক্ষরতার কারণে ধর্মীয় চরমপন্থা বাড়ছে। আর এর কারণেই ধর্মকে কাজে লাগিয়ে বেশ সরব হয়ে ওঠছে দুই শ্রেণির মানুষ। একদল ধর্মভীরু আর একদল হচ্ছে ধর্মের নামে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।’

ডক্টর কেসলার সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘সবারই আলাদা আলাদা মতবাদ আছে আর ধর্মীয় মতবাদগুলো আমরা কিভাবে গ্রহণ করবো তা সম্পূর্ণ আমাদের নিজেদের উপর নির্ভর করে। বাইবেলে যেসব সমস্যার বর্ণনা দেয়া আছে কোরআন এবং তাওরাতেও একই সম্যার উল্লেখ আছে। তবে এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে কিভাবে এটাকে ব্যবহার এবং অপব্যবহার করা হচ্ছে তার উপরে। আর এই সবকিছুর পেছনে যে সব সময় নীরব ভূমিকা পালন করে সে হচ্ছে ইশ্বর।

A.H.R-7