২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ৯:৩২

সব মেনে নিয়ে এক দিন যাবো সরে : চলে গেলেন অধ্যাপক শিবাজী দে

 

বিশেষ আলেখ্যঃ গত দুই দিন যাবৎ আমার জ্বর, প্রচন্ড মাথা ব্যাথা। সিজেন চেঞ্জে হচ্ছে। শীত এরই মধ্যে ঢাকাতে হানা দিয়েছে। গত দুই দিনে বাসার বাইরে যায়নি। আসরের নামাজের পর অসুস্থ শরীর নিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। ঘুম ভাঙলো রাত ৮ টায়। বালিশের পাশে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলাম কে কে কল দিয়েছে। কে কে ফেসবুক মেসেন্জারে নক করেছে?


শেলী মেসেঞ্জারে লিখেছে, শিবাজী পিজির আইসিইউতে। লাইফ সাপোর্টে আছে। আমি আর সোনিয়া দেখতে গিয়েছিলাম। একেবারেই শেষ অবস্থা। ডাক্তার মানুষিক প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। সাপোর্ট উইথড্র করলেই সব শেষ। তুই যা লুৎফর। ওকে শেষ বারের মতো দেখতে যা। আমি কল দিলাম শেলীকে। বললাম, আমারতো জ্বর। শরীর দুর্বল। শেলী কান্না ভেজা কণ্ঠে বললো, তুই যা।


চোখের সামনে শিবাজীর সাথে আমার হাজারো স্মৃতি ভেসে আসছে। দ্রুত কাপড় পরে মিরপুর রূপনগর থেকে শাহবাগ পিজির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। পথের মাঝেই অরুনকে ফোন করে জেনে নিলাম কারা কারা আছে, ওখানে। শিবাজীর এই মৃত্যর সাথে পাঞ্জা লড়াই যুদ্ধে সার্বক্ষণিক ভাবে সহযোদ্ধা হিসাবে পিজিতে অবস্থান করছে শিবাজীর স্ত্রী বনানী দে, বন্ধু তুহিন, তৌহিদ,শাহাবুদ্দিন, মলি, রানু, ইকবাল সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৫/৮৬ শিক্ষা বর্ষের দর্শন বিভাগের অনেক বন্ধুরা। গত ৫/৬ দিনেই সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে সারাদেশ সহ সারা দুনিয়ায় আমাদের সব বন্ধুরা জেনে গেছে ।


গত পরশু রাতে নিউইয়র্ক থেকে রাত ৩ টায় আমাকে অনলাইনে দেখে, নাজনীন নিনা জানতে চাইলো শিবাজীর এখন কি অবস্থা?
আমাদের শিবাজী ভালো নেই। আমাদের শিবাজী পিজির আইসিইউতে জীবন মরণ যুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে।


পিজির ৭ তলায় লিফ্ট থেকে নেমেই দেখি, মলি আর রানু বনানী বৌদিকে শান্তনা দিচ্ছে। চোখ মুছিয়ে দিচ্ছে বৌদির । কিন্তু ওদের নিজেদের চোখের পানি আটকাতে পারছেনা। টপ টপ করে করে পানি ঝরছে রানু, মলি আর অর্চনার চোখ দিয়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ৮৯ ব্যাচের সংগঠন ” স্বপ্নিল” এর নিয়মিত গেট টুগেদারে শিবাজী দে।

 


ভিজিটরদের চেয়ারে বসে আছে তুহিন, তৌহিদ। আমি অর্চনার ডাক্তার স্বামীর কাছে জানতে চাইলাম, চান্স কত টুকু ? উনি বললেন, একজন চিকিৎসক হিসাবে যা বুঝি, নো চান্স, বাট উই ক্যান প্রে ফর শিবাজী, লাইফ সাপোর্ট থেকে সে ফিরে আসুক আমাদের মাঝে।

ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। শিবাজী তুই যাসনা। আমাদের ছেড়ে তুই যেতে পারিসনা। তুই থাক দোস্ত। তুই আমাকে কলাভবনে, আমাদের ডিপার্টমেন্টের সামনে শান বাঁধানো আমতলায় নিয়ে গান শুনাবি না? মান্না দে’র গান। ওই যে, ”সোনার এ দিনগুলো, জীবনের দিনগুলো চলে যায়, যাবে চলে…….

আইসিইউ এর ওয়েটিং রুমের ফ্যানটা মাথার উপর ঘুরছে। তাকিয়ে আছি শূন্যে ঝুলানো ফ্যানের দিকে। মনটা চলে গেছে ৮০ এর দশকে।

ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এরশাদ ভ্যাকেশনে। স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন তুঙ্গে উঠলেই কতৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়বন্ধ করে দেয়। হল ভ্যাকেন্ট। শিবাজী থাকতো জগন্নাথ হলে, আর আমি থাকতাম জহুরুল হক হলে। এরশাদ ভ্যাকেশনে আমরা পৃথিবীর কিছু অভিমানী সন্তান বাড়ি যেতাম না। চোরাই ভাবে হলে থেকে যেতাম। রাতের বেলা টেবিল ল্যাম্পের উপর শেড দিয়ে পুলিশ আর্মির ভয়ে আলোকে লুকিয়ে রাত পার করে দিতাম । শিবাজী, সাঈদ সোহরাব, তুষার, অশোক, মিজান, জালাল,বাধনদের সাথে। জগন্নাথ হলে।

 

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের এলামনাই এসোসিয়েশনের বাৎসরিক মিলন মেলায় শিবাজী দে।


মাঝে মাঝেই আমরা কলাভবন, হাকিম চত্বরে, অথবা চোরাই পথে টিএসসির বারান্দায় বসে আড্ডা দিতাম। একদিন উদাস করা ঘুঘু ডাকা দুপুর বেলা। চারিদিকে শুনশান নীরবতা।কলাভবনের পূর্ব গেটের সামনে শান বাঁধানো আম তলা। শিবাজী সহ আমরা ৪/৫ জন বন্ধু। বরাবরের মতো শিবাজীর প্রতি আমার আবদার, দোস্ত মান্না দে’র গান ধর। অসম্ভব ভালো গান গাইতে পারতো সে। বিশেষ করে মান্নাদের ভরাট গলা যেন শিবাজীর গলায় ভর করতো। হৃদয় নিংড়ে বুকের ভিতর থেকে শব্দ, সুর বের করত শিবাজী। সোনার এ দিনগুলো, জীবনের দিনগুলো ঝরে যায়, যাবে ঝরে। তারে ধরাও যায়না, ছোঁয়াও যায়না, মায়ার বাঁধনে তারে বাধাও যায়না। সব মেনে নিয়ে এক দিন যাবো সরে …….. শিবাজী গাইতো আর আমাদের আবেগ উথলে চোখ ঝাপসা হয়ে যেত।


পিজির আইসিইউ এর বাস্তবতায় ফিরে এসে, দেখি সাহাবুদ্দিন আর ইকবাল এর মাঝেই পাশে বসে আছে। রাত ১২ টায় বিদায় নিয়ে বাসায় ফিরলাম। মনটা ভীষণ খারাপ। শিবাজীর জন্যে মনটা কাঁদছে।

আজ খুব সকালে ঘুম ভেঙেছে। ৭ টার আগেই। অথচ ঘুমিয়েছি রাত ৩ টায়। আমার ওয়াইফ বললো, তোমার মোবাইলে ভোর সাড়ে ৪টা থেকে অনেক কল এসেছে। আমি ডেকেছি। তুমি জাগোনি। বুকটা ধ্বক করে উঠলো। বুঝে ফেললাম এক নিমিষেই। অল কোয়াইট ওন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। জাসদ ছাত্রলীগের মিরপুরের চন্দন (কিলার, ৯০ দশকেই নিজ দলীয় অন্তর্দ্বন্দে গুলি খেয়ে মারা যায়) আমার মাথায় কলাভবনে যেদিন পিস্তল ঠেকায়, সেদিন আমার সারা শরীর যেমন হিঁম শীতল বরফ হয়ে গিয়েছিল, সে রকম একই অনুভূতি, হিঁম স্রোত বয়ে যাচ্ছে আমার শরীরে। চলে গেল বসন্তের দিন। শিবাজী তুই আমাদের বসন্ত কেড়ে নিয়ে চলে গেলি। না ফেরার দেশে। ভালো থাকিস দোস্ত। তুইতো স্বর্গেই থাকবি….. তোর মত এতো ভালো মানুষ কোথায় পাবো?

পুনশচঃ অধ্যাপক শিবাজী দে ১৬ তম স্পেশাল বিসিএস ক্যাডার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ৮০ এর দশকের ছাত্র। তাঁর সর্বশেষ কর্মস্থল, কুমুদিনী সরকারি মহিলা কলেজ টাঙ্গাইল। স্ত্রী বনানী দে, নবম শ্রেণীর ছাত্রী বড় কন্যা মন্দিরা দে সহ আরো দুই শিশু কন্যা,অসংখ্য বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন গুনগ্রাহী রেখে আজ ২৩ শে নভেম্বর ২০১৭ ইং এ ভোর সাড়ে ৪ টায় পিজির আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে যায় শিবাজী দে।

 


লেখকঃ লুৎফর রহমান, অধ্যাপক শিবাজী দে’র বন্ধু, কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ।

 

কিউএনবি/রামিম/২৩ শে নভেম্বর ,২০১৭ ইং/সকাল ১১:২৮