২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ২:০৩

ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক কমছে ধানের ফলন

 

ডেস্ক নিউজ : ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক থাকার কারণে বাংলাদেশে ধানের ফলন কমছে। ফলে প্রকৃত উত্পাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষিপ্রধান এ দেশটি। ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক এবং ধান আবাদে এর প্রভাব নিয়ে সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক থাকলে  মাটিও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আর্সেনিকযুক্ত হয়ে পড়ে এবং এতে ধান উত্পাদন ৭ থেকে ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

ব্রিটেনের মাস্যাচুসেট্স ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির (এমআইটি) সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং (সিইই) বিভাগের অধ্যাপক চার্লস হার্ভে এবং তার গবেষণা টিম বাংলাদেশের ফরিদপুরে দু’বছর ধরে গবেষণা করে এমন তথ্য পেয়েছেন। গবেষক দলটি ২০১৫ এবং ২০১৬ সালের উত্পাদন মৌসুমে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। চলতি মাসে আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির জার্নাল ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’তে এ বিষয়ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১০ থেকে ১০০ গুণ পর্যন্ত বেশি। গ্রামাঞ্চলে কূপ থেকে পানি সংগ্রহ করে পান করে মানুষ হূদরোগ ও ক্যান্সারসহ নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। তারা আরো বলছেন, আর্সেনিক একটি প্রাকৃতিক উপাদান যা বিশ্বজুড়ে পাওয়া যায়, তবে কিছু জায়গায় ভূগর্ভস্থ পানির আর্সেনিকের মাত্রা অনেক বেশি।  প্রতিবেদনে বলা হয়, চাল বাংলাদেশের একটি প্রধান ফসল এবং এটি প্রায় ১৬ কোটি মানুষের দেশে ক্যালরির প্রাথমিক উত্স। কৃষকরা স্বাধীনভাবে ফসল ফলায়। প্রাথমিকভাবে দুই ধরনের চাল উত্পন্ন করে, যা একটি মৌসুমী চক্রের উপর কাটা হয়। বোরো চাল শীত মৌসুমে চাষ করা হয় এবং এ ধানে প্রচুর সেচের প্রয়োজন হয়। জমিতে সেচ দিতে ব্যবহূত পানি ভূগর্ভ থেকে কুয়ায় আসে। এ সময় আর্সেনিক মাটির বিভিন্ন স্তরে এসে জমা হয়। আবার এই পানি সেচ হিসাবেও ব্যবহার করা হয়।

বোরো ধানের ফলন যাচাইয়ে হার্ভে ও তার সহযোগীরা পানির প্রভাব নির্ধারণের জন্য ১৬টি স্থানীয় ধানের আবাদ করেন এমন কৃষকদের সাথে কাজ করেন। তারা একই ধরনের অন্যান্য ধানের ফলনের সাথে গবেষণা প্লটের ধানের ফলন মূল্যায়ন করেন। তারা প্রমাণ করেন, মাটিতে আর্সেনিকের ফলে বোরোর বার্ষিক ফলন ৭ দশমিক ৪ থেকে ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। গবেষক দল বেশ কয়েকটি চালের খামার থেকে মাটি সংগ্রহ করেন এবং এর আর্সেনিক মাত্রাও হিসাব করেন। গবেষকরা বিভিন্ন ধানের জমির ফসল সংগ্রহ ও রেকর্ড করেন এবং দেখেন, যে পরিমাণে চাল উত্পাদন হ্রাস হয় তা মাটির আর্সেনিকের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ব্যবহূত পানির ৯৭ ভাগ সেচকার্যে ব্যবহার হয়। ভূগর্ভস্থ পানির তুলনায় উপরিভাগের পানি সেচের জন্য অধিক উপযোগী হলেও শুষ্ক মৌসুমে ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বা পর্যাপ্ততা না থাকায় দেশের ৭৮ ভাগ সেচ ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীল। তাই সেচকার্য পরিচালনায় প্রতিবছর গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।

প্রচলিত সেচ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশে প্রতি কেজি ধান উত্পাদনে প্রায় ৩-৪ হাজার লিটার সেচ পানি প্রয়োজন। অতিমাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে ভূগর্ভস্থ পানিস্তরের ক্রমাগত নিম্নগামিতা হচ্ছে। এ কারণে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে তেমনি বেড়ে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের সংমিশ্রণ, মাটির জৈব উপাদান ও পুষ্টিমান কমে যাচ্ছে এবং মাটি হারাচ্ছে তার গুণগতমান। বাংলাদেশের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শাহজাহান কবীর দেশে আর্সেনিক ও ধানে এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘মাটিতে আর্সেনিকের মাত্রা ২০ পিপিএম এবং পানিতে এই মাত্রা ১০০ পিপিবি’র বেশি হলে ধান গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ধানের ফলন কমে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্ধেক কমে যায়।’ তিনি আরো জানান, মাটি বা পানিতে আর্সেনিক থাকলে তা ধানে বা চালে যাওয়ার সুযোগ নেই। ব্রিধান ৪৭ অতিমাত্রায় আর্সেনিক সহ্য করতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জানান, দেশের ফরিদপুর, সাতক্ষীরা, যশোর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালির সেনবাগ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি।

কিউএনবি/রেশমা/২৬শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং/ সকাল ৯:২০