ব্রেকিং নিউজ
১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৫:৫২

ঘুরে দাঁড়াতে চান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

 

ডেস্ক নিউজ : দেশে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে ১৩৭ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের মোট ২৪ জেলার ক্ষতিগ্রস্ত সাত লাখ ৭৬ হাজার ২০২ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রণোদনা হিসেবে বিনামূল্যে পাচ্ছেন বীজ ও সার এবং সহায়তা হিসেবে নগদ অর্থ। ইতোমধ্যেই সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত কৃষি কমিটি কৃষকদের তালিকা চূড়ান্ত করেছে। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে থেকে এসব সহযোগিতা মাঠ পর্যায়ে চলে গেছে বলেও জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।

মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু কিছু জেলায় সার-বীজ বিতরণ শুরুর তথ্য পাওয়া গেছে। নভেম্বরে আমন ধান তোলার পর বোরো ধান চাষের জন্য সেচের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকরা। ধান ও শাকসবজি চাষের জন্য বীজতলা ও মাঠ তৈরি করছেন। নগদ অর্থ পেয়ে পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।

এ ব্যাপারে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, সরকারের এ সহায়তা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে, আগামী বোরো উৎপাদন বাড়াতে, বোরো আবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে, ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমিয়ে কৃষকদের দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলতে এবং সমসাময়িক পতিত জমি আবাদের আওতায় এনে শস্যের নিবিড়তা বাড়াতে সাহায্য করবে। ক্ষতিগ্রস্ত একজন কৃষকও সহায়তা থেকে বাদ পড়বেন না।

তবে সরকারের কৃষি বিভাগের দেওয়া এসব তথ্যে মাঠ পর্যায়ে কিছুটা গরমিল দেখা গেছে। প্রান্তিক কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যে ভর্তুকি বা প্রণোদনা দিচ্ছে, তা বিতরণে অনিয়ম হচ্ছে। কৃষি কমিটির তৈরি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে মুখচেনা স্বাবলম্বী কৃষকদের নামও স্থান পেয়েছে। বাদ পড়েছেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক। প্রণোদনা নিতে প্রয়োজনীয় কার্ডের জন্য নগদ অর্থ দিতে হচ্ছে। একইভাবে এলাকাভিত্তিক প্রয়োজনীয় সহায়তা সময়মতো পৌঁছাচ্ছে না। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তুলনায় সহায়তা অপ্রতুল বলেও অভিযোগ আসছে। অনেক কৃষক চারা ও বীজ পাচ্ছেন না। আবার নিজেরা এসব উপকরণ কিনবেন, এমন সামর্থ্যও তাদের নেই। একইভাবে সরকারের দেওয়া নগদ অর্থ ক্ষতির তুলনায় বেশ কম বলেও জানিয়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। কোনো কোনো জেলায় এখনো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ শেষ হয়নি বলেও জানা গেছে।

এমন অবস্থায় কৃষিবিদ ও কৃষি উন্নয়ন গবেষকরা সরকারকে সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, ইতোমধ্যেই রবি ফসলের মৌসুম শুরু হয়েছে। এ সপ্তাহের ভারী বর্ষণের কারণে এসব ফসলের বীজ বোনার জন্য মাটির ‘জো-কন্ডিশন’ তৈরি হতে আরো সপ্তাহ দুই সময় লাগবে। সুতরাং এ সপ্তাহের মধ্যেই প্রান্তিক কৃষকদের কাছে চারা-বীজ ও সারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছাতে হবে। কৃষকরা তৈরি। এখন দরকার সহায়তা। দেরি হলে ফসলের কাক্সিক্ষত উৎপাদন হবে না। ভবিষ্যতে খাদ্যশস্য ঘাটতি দেখা দেবে। আর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরাও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্স স্টাডিজের ফেলো কৃষিবিদ ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. গোলাম রাব্বানী বলেন, দুর্যোগপরবর্তী কৃষকদের পুনর্বাসন করতে হলে সরকারকে ‘র‌্যাপিড অ্যাসেসমেন্ট’ তৈরি করতে হবে। উপকরণের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মূল্যায়ন করতে হবে। কৃষিঋণ মওকুফ করতে হবে। উপযুক্ত সময়ে কৃষকদের হাতে উপকরণ পৌঁছানো না গেলে আমরা ফসলের কাক্সিক্ষত উৎপাদন পাব না।

এই গবেষক আরো বলেন, বর্তমানে দেশে মোট জনসংখ্যার ৫০-৬০ শতাংশ কৃষক। অর্থাৎ এ পরিমাণ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে ৩০ শতাংশই প্রান্তিক কৃষক। সুতরাং দুর্যোগের মুখে পড়া এসব কৃষক সহায়তা না পেলে উৎপাদন কমে যাবে। নিরুপায় কৃষকরা বেঁচে থাকতে পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে গেলে সার্বিক কৃষিব্যবস্থার ক্ষতি হবে।

অবশ্য এ ব্যাপারে আশ্বাসের কথা শুনিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. গোলাম মারুফ। তিনি বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে চারা-সার ও বীজ এবং নগদ অর্থ বিতরণ শুরু হয়ে গেছে। মাঠ পর্যায়ে এসব উপকরণ চলে গেছে। প্রণোদনা হিসেবে বিনামূল্যে বীজ-চারা ও সার দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, ক্ষতিগ্রস্ত একজন কৃষকও বাদ পড়বেন না।

কৃষি মন্ত্রণালয়ে তথ্য অনুযায়ী, এবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ২৪ জেলায় সাত লাখ ৭৬ হাজার ২০২ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে কৃষি পুনর্বাসন হিসেবে ১৩৬ কোটি ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫১ টাকার সহায়তা দিচ্ছে সরকার। এর মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের ছয় লাখ কৃষককে ১১৭ কোটি টাকার বীজ, ডিএপি ও এমওপি সার এবং নগদ এক হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। আর নওগাঁ, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, রংপুর, নাটোর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, শেরপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক লাখ ৭৬ হাজার ২০২ জন কৃষক পাবেন ১৯ কোটি ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫১ টাকার গম, ভুট্টা, সরিষা, চিনাবাদাম, খেসারি ও বোরো ধান চাষের জন্য বীজ, ডিএপি ও এমওপি সার এবং শাকসবজির বীজ। সরকারের দেওয়া এই সহায়তায় হাওরাঞ্চলের ছয় জেলায় ছয় লাখ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করা যাবে এবং প্রতিহেক্টর জমিতে চার দশমিক ০৪৮ মেট্রিক টন হিসেবে তিন লাখ ২৪ হাজার ৪৯৫ টন চাল উৎপাদিত হবে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

তবে মাঠ পর্যায়ে সরকারের এসব সহায়তা ঘিরে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ করেছেন প্রান্তিক কৃষকরা। আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, হাওর অঞ্চলে এখনো ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শেষ হয়নি। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে কৃষি ভর্তুকির বীজ ও সার বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার ১১ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সরকারিভাবে মাত্র ১৬৫৪ কৃষককে সহযোগিতা করা হচ্ছে। কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের হাতে এখনো সাহায্য এসে পৌঁছায়নি। শেরপুরের চার উপজেলায় ৩২ হাজার ১১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে সরকারিভাবে এখনো পর্যাপ্ত সাহায্য পাওয়া যায়নি। জামালপুরের সাত উপজেলায় অতিবৃষ্টি ও দুই দফা বন্যায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা মূল্যের শস্য ক্ষতি হয়েছে। এতে জেলার ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, মেলান্দহ, সরিষাবাড়ী, মাদারগঞ্জ ও সদর উপজেলার মোট ৬৮ ইউনিয়নের ৫ লাখ ৬১ হাজার ৩০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। অথচ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে সরকারিভাবে এখনো পর্যাপ্ত সাহায্য পাওয়া যায়নি। জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক আবু হানিফা বলেন, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে। এর আগে আমন চারা এবং ইতোমধ্যেই মাসকলাই বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে তা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকদের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আক্কাস আলী। তিনি বলেন, হাওর অঞ্চলে আমনে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাদের সাহায্য দরকার। উৎপাদন বাড়াতে হলে প্রণোদনা দিতে হবে। বিশেষ করে রবি ফসলের মৌসুম শুরু হয়েছে। মাটির ‘জো-কন্ডিশন’ (বীজ বা চারা বোনার জন্য মাটির উপযুক্ততা) সম্প্রতি বৃষ্টির জন্য কিছুটা পিছিয়ে গেছে। আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে কৃষকদের কাছে চারা, বীজ ও সার পৌঁছাতে হবে। বিতরণটা দ্রুত করতে হবে। সামনে বোরো ধানের মৌসুম। গম, ভুট্টা, মাসকলাই, তেল ফসল, আলু, শাকসবজিসহ রবি ফসলের সময়। উপকরণ পেতে দেরি হলে মৌসুম চলে যাবে। কাক্সিক্ষত উৎপাদন পাব না। সুতরাং বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে হলে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

একইভাবে ডা. গোলাম রাব্বানী বলেন, এ বছর বেশ কয়েকটি দুর্যোগ গেছে। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। সুতরাং সব সুবিধা সময়মতো দিতে হবে। এখন আর এক দিনও দেরি করা যাবে না। সেচের মৌসুম আসছে। সেচের খরচ ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। কৃষিঋণ দিতে হবে। সুদ কমাতে হবে। কৃষকদের ফসল উৎপাদনে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে হবে।

কিউএনবি/রেশমা/২৫শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং/সকাল ১০:২৬