২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ১:৪৬

পলাতক জীবনের দিনলিপি : মাতৃস্বাদ

 

মা অমুল্য সম্পদ, তাঁরাই বুঝেন যাদের মা আছেন এবং যাদের মা মৃত্যুবরণ করেছেন, তবে যাদের মা জীবিত নাই তারাই মা এর অনুপস্থিতির ব্যথাটা প্রতি নিশ্বাসে নিশ্বাসে উপলব্ধি করেন। ৮০/৯০ বছরের বৃদ্ধকেও দেখেছি মা এর জন্য কি অঝোর ধারায় কান্না। পৃথিবীতে মা এর বিকল্প মা ই। মা এর শাড়ীর আঁচলের ঘ্রান পৃথিবী বিখ্যাত কোন পারফিউম কোম্পানীর, যে কোন মুল্যবান পারফিউমের ঘ্রানের চেয়েও পবিত্র এবং হৃদয়গ্রাহী।

জন্মের পর থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত অর্থ্যাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পূর্ব পর্যন্ত আমি মা এর কোলেই ছিলাম বলা চলে। আমার স্কুল জীবন কলেজ জীবন কেটেছে মফস্বলে । যদিও আমার জন্ম হয়েছিলো ঢাকার আজিমপুর ম্যাটারনিটিতে । আজিমপুরের একটি স্কুলে ভর্তিও হয়েছিলাম । পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের গ্রামে চলে যেতে হয়, গ্রামে যেয়ে স্কুল কলেজ শেষ করেই ঢাকা আসি।

আমার জীবন জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত কখনই মসৃন ছিলো না, কন্টাকীর্ন পথ পাড়ি দিচ্ছি সবসময়, এ যেনো জন্ম থেকে জ্বলছি..আমার বাড়ীর পাশেই ছিলো স্কুল এবং আমাদের ঘরের পাশেই ছিলো একটা শান বাঁধানো পুকুর। স্কুল ছুটির পরে ঐ পুকুরে হাত পা ধৌত করতে করতে চিৎকার করতে করতে বলতাম মা খাবার রেডি করো,ঘরে ঢুকেই খাবার রেডি পেতাম এ ভাবেই চলে গেলো আমার স্কুল এবং কলেজ। কলেজ জীবন শেষ করে যখন উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকাতে আসলাম এই প্রথম অনুভব করলাম মা অনেক দুরে, ক্ষুধা লাগলেও চিৎকার করে বলতে পারি না মা ক্ষুধা লেগেছে, খাবার পছন্দ না হলেও বলতে পারছি না খাবার খাবো না,  প্রতিটি মূহূর্তে মাকে মিস করছি ।


যাহোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, বাবা-মা দুজনেই খুশী, কিন্তু মা কিছুটা চিন্তিত । মা বললেন বাবা শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবার খুব খারাপ এবং শুধু গোলগুলি হয়, আমি বললাম মা তোমার দোয়া থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবার আমার কাছে বেহেস্তের মেওয়া মনে হবে। তারপরও মায়ের চোখের পানিতো আর বন্ধ হয় না, বললো বাবা সময় মত খাবি সবসময় ।

যা হোক বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হলো ইতিমধ্যেই আমার সহজ সরল মা এর গুনধর পুত্র (!) রাজনীতির কন্টকাকীর্ন পিচ্ছিল পথের পথচারী হলেন ।  মা এর আদর ভালোবাসার চেয়ে মিছিল স্লোগান আপন মনে হলো। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধে মা এর কোলে যাওয়ার চেয়ে হলে বন্ধুদের সাথে থেকে যাওয়াটা স্বর্গীয় মনে হলো । এর মাঝেও মাঝে মাঝে মা এর চিঠি “বাবা ঠিক মত খাবে, মাথায় তেল দিবে, পা এ তেল-পানি মাখবে” কারন আমার পা গরম থাকতো,বাড়িতে আর যেতে ইচ্ছে হয় না । ইচ্ছে হয় স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করি ক্যাম্পাস । বাড়িতে গেলে হয়ত আমি এই স্লোগানকে মিস করবো মিস করবো আমার দলের ভালোবাসাকে, মিস করবো আমার প্রিয় বন্ধুদের ।

এখন বাড়ী যাওয়াটা হয়ে গেলো গৌন,বড় ভাই বন্ধুদের সাথে থেকে মিছিল মিটিং করাটা যেনো হয়ে গেলো মুখ্য। তারপরও কদাচিৎ যদি বাড়ী যেতাম প্রথমে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষন কান্না তারপর আমার কপাল এবং গালে মা এর আদর ।পরবর্তী বাড়ীতে যে ২/৩ দিন থাকতাম আমার পছন্দের সব খাবার গুলো রান্না করতেন, আর শেষ দিন মা মাংসের পাতিলের তলায় অবশিষ্টাংশ ঝোল মাংস দিয়ে ভাত মেখে নিজে হাতে খাওয়াতেন । যদিও মা আমার এই প্রিয় খাবারটি এখনও নিজ হাতে আমাকে খাওয়ান। বাড়ী থেকে বিদায়ের দিন মা জড়িয়ে ধরে আমার কপালে আদর করে দোয়া করে দিতেন । ঐ দোয়া এবং আদরে আমি নিজকে সুপারম্যান ভাবতাম, ভাবতাম মা এর পবিত্র চুম্বন আমার কপালে আছে ইনশাআল্লাহ কোন ষড়যন্ত্রই আমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।

এ এক কঠিন বিশ্বাস নিয়ে ক্যাম্পাসে চলতাম,আর সবসময় মনে হতো মা আমার বুকের ভিতরে রয়েছে, এখনো তাই মনে করি, অনেক চরাই উৎরাই পার হয়ে যে আজ এ পর্যন্ত সুস্থ এবং সম্মান নিয়ে পেশাগত জীবন যাপন করছি তা শুধু আল্লাহর রহমত এবং আমার মা জননীর দোয়া । যা হোক যে কারনে এত কিছু লেখা সেটাই বলছি, আগের কিছু লেখায় আমার হুলিয়া জীবনের বিভিন্ন অম্ল মধুর অভিজ্ঞতার কথা বলেছি, হুলিয়া জীবনে অনেকের বাসার ড্রইংরুম থেকে শুরু করে বেড রুমেও ঘুমিয়েছি, হুলিয়া জীবনে স্বাভাবিক কারনেই মা এর সাথে দেখাটা কম হতো । কিন্তু বিভিন্ন বাসায় থাকতে গিয়ে আমি অনেক “মা” পেয়েছিলাম,তারা জন্মদাত্রী মা না হলেও তাদের নিজের সন্তানের চেয়ে কোন অংশেই কম আদর করতেন না আমাকে। অসম্ভব স্নেহ করতেন মায়েরা আমাকে, টেনশনও করতেন আমাকে নিয়ে, আমি এই শ্রদ্বাভাজন মা দের কাছ থেকে আমার প্রকৃত মা এর মতই মাতৃস্বাধ পেয়েছি, এই মহিয়সী মাদের নিয়ে “বন্ধন” এপিসোডে লিখেছিলাম ।

 

পলাতক জীবনে বিভিন্ন আশ্রয় খুঁজতে খুঁজতে এক বন্ধুর বদান্যতায় একটি বাসা পেলাম,ওনারা পাঁচ তলার বাড়ীর মালিক ২য় তলায় থাকেন বাকি ৩টি ফ্লোর ভাড়া,শিল্পপতি বাড়ীওয়ালা আমার বন্ধু ঐ বাসায় জানালেন হলে থাকতে সমস্যা হচ্ছে তাই কিছুদিন থাকবেন । তথাস্থ আমরা রাত ১০টায় আমার বন্ধু সহ হাজির হলাম ।উষ্ণ সম্বর্ধনার মত অবস্থা সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে । আমরা কিছুটা লজ্জিত ও শংকিতও বটে, যদি কেউ আমাদেরকে চিনে ফেলে, ড্রইংরুমে সবার সাথে পরিচয় হলো খালু কিছুটা রাশভারি, আমার ঐ বাহক বন্ধু কোন রকম তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করলাম ।

এর মধ্য খালাম্মা নিজে আমাদের থাকার রুমে বিছানাপত্র পানি বিস্কিট রেখে গেলেন। সকালের নাস্তাও জেনে নিলেন নাস্তায় কি কি খাই । আমরা মাতৃস্বাদে আহ্বলাদিত। ড্রইংরুমে বসে খেয়াল করলাম ঐ বাসার দৈনিক পত্রিকা ছিলো ইত্তেফাক । কারন ঐ সময়ে প্রায়ই ১/২ দিন পর পর দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকা আমাদেরকে অত্যাধিক ভালোবেসে (!) নীরুভাই, অভিভাই , মাসুদ এবং আমার এই চারজনের ছবি ছাপাতেন আর লিডনিউজ থাকত এদেরকে ধরিয়ে দিন , ২০০০০ টাকা পুরুস্কার ।আরো অনেক কথা, ইনকিলাবের ঐ বিশেষ ভালোবাসার (!) কোন শানেনযুল আজো খুঁজে পেলাম না। বাসায় ইত্তেফাক থাকার কারনে আমি আর জুয়েল কিছুটা নিশ্চিন্তে থাকলাম। খালাম্মা তার নিজের সন্তানের মত আপ্যায়িত করাতেন। আমরা যেনো আমাদের মা এর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি। আমরা যখন বাসায় ঢুকতাম বাসার অনান্য সদস্যরা ঘুমিয়ে থাকতেন, খালাম্মা শুধু সজাগ থাকতেন।

এই বাসায় আমার নাম ছিলো শীমুল আর জুয়েলের নাম ছিলো বিপ্লব ।পলাতক জীবনে অপরিচিতদের বাসায় আমরা এই নামেই থাকতাম । তৃতীয় দিনে বাসায় ঢুকে দেখি ডাইনিংরুম ও ড্রইংরুমে লাইট জ্বলছে খালাম্মা অস্থির ভাবে পায়চারি করছেন আমরা ড্রইংরুমে বসলাম সব কিছু কিছুটা অন্যদিনের চেয়ে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে , খালাম্মাকে কিছুটা বিধ্বস্থ এবং বিপর্যস্থ মনে হলো।কোন সূচনায় না যেয়ে বললো বাবা আজ চার তলায় ভাড়া নিতে যেয়ে ইনকিলাব পেপারে তোমার ছবি দেখলাম আর সব পড়লাম, আমি ভাড়াটিয়াকে কিছু বুঝতে না দিয়ে পেপারটা নিয়ে আসছি ।আমি আর জুয়েল তো হতভম্ব কি বলবো বুঝতে পারছি না।শুধু বললাম সবই ষড়যন্ত্র, সাময়িক ঝামেলা, ইনশাআল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে।খালাম্মা বললেন তোমাদের মা বেঁচে আছেন ? বললাম হ্যা, তারা কি সুস্থ আছেন ? বলেই খালাম্মা কান্না জড়িত কন্ঠে বললেন আমারই তোমাদের জন্য এত কস্ট হচ্ছে, তোমার মা দের যে কি অবস্থা আল্লাহই জানেন এ কথা বলে তার রুমে গেলেন,একটু পরে ২টা নামাজ শিক্ষা নিয়ে আসলেন, বললেন বাবা তোমরা কি আয়াতাল কুরসি দোয়া পড়তে পারো..? জুয়েল পারতো আমি পারতাম না। আমি দোয়া ইউনুস পারতাম, খালাম্মা আমাকে বললো তুমি আয়তাল কুরসি দোয়া শিখবে এবং তোমরা দুজন সারাক্ষন এই দোয়া পরবে। দেখবে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ রহমত করবেন এবং খালাম্মা বললেন এ বাসায় কেউ এ বিষয় জানে না সুতারং চিন্তা করবে না, আর মা এর মত কঠিন নির্দেশ জারি হলো কোন জরুরী কাজ ছাড়া বাহিরে যাওয়া চলবে না, তোমাদের কাজ খাওয়া ঘুম এবং নামাজ পড়া । যতদিন খুশী তোমরা তোমাদের মা এর বাসায় থাকতে পারবে।


পরবর্তীতে এই মহিয়সী মা এর বাড়িতে দীর্ঘদিন ছিলাম, এ ভাবে অনেক মা দের আদরে সিক্ত হয়েছি,হয়ত তারা জন্মদাত্রী মা ছিলেন না কিন্তু সন্তানের বিপদে আমার গর্ভধারিনী মা আমার জন্য যা করতেন এই মহিয়সী মায়েরাও তাই করেছেন, এই মহৎ মায়েদের জন্য হৃদয়ের গভীর থেকে নিরন্তর দোয়া থাকে সবসময়,যুগ যুগ সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকুন আমার এই মায়েরা।


এখনো আমি প্রতিদিন আয়তাল কুরসি দোয়া পড়ি, নামাজ পড়ি ,মাতৃস্বাদে যে সব মহিয়সী মায়েরা আমাকে তাদের আচঁলের নিচে আশ্রয় দিয়েছেন তাদের জন্য দোয়া করি।

 

লেখক : এড. কামরুল ইসলাম সজল, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ 

 

কিউএনবি/তানভীর/২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং/বিকাল ৩:০৭