১৮ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১:৫৯

পলাতক জীবনের দিনলিপি

 

আমাদের বৈচিত্রময় জীবনে কত ধরনের যে অভিজ্ঞতা কখনো তিক্ত কখনো হাস্যকর কখনো হৃদয়বিদারক কখনো মনে হয়েছে এ জীবনতো আমি চাইনি,হৃদয়ের রক্তক্ষরন নিয়ে ভাবতাম আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়েছি পাশ করে একটা চাকুরী করবো মাস শেষে বেতন তুলবো,স্বাভাবিক জীবন যাপন করবো ।

এ ভাবনাটা তখনই আসতো যখন কোন বিব্রতকর অবস্থায় পড়তাম, ছাত্ররাজনীতির সুবাদে হুলিয়া নিয়ে কত বাসায় যে ঘুমিয়েছি কতজনের কাছ থেকে যে আর্থিক এবং মানষিক সাহায্য নিয়েছি তা চিন্তাও করা যাবে না,তার তালিকা অনেক দীর্ঘ।

বিভিন্ন সুখকর অভিজ্ঞতার মধ্য চোখে পানি আসার মত কিছু তিক্ত বিব্রতকর অভিজ্ঞতায়ও সমৃদ্ধ হয়েছিলাম,হুলিয়া জীবনে কোনো বাসায় থাকতে যেয়ে রাত ১১ টায় যদি বলা হতো আজ এখানে থাকা যাবে না বা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলা হতো কাল সকালে গুরুত্বপূর্ণ মেহমান আসবে সুতারং থাকা যাবে না,ঐ রাতে প্রচন্ড মনোকষ্ট নিয়ে অনেক সময় রাস্তায় এসে কেঁদে দিতাম আর তখনই ভাবনায় আসতো “এ জীবনতো চাই নি” ।

ঐ রাতেই হয়ত অন্য কোন আশ্রয়ে আমরা হাজির হতাম,পলাতক জীবনে কখনো আমি অভি ভাই এর সাথে কখনও বন্ধু মাসুদের সাথে কখনো বন্ধু মরহুম জুয়েলের সাথে থাকতাম,তবে জুয়েলের সাথেই বেশী থাকা হতো,জীবনে অনেক বাসায়ই রাত্রি যাপন করেছি প্রায় বাসায়ই আমার প্রিয় ছিলো ড্রইংরুম আর জুয়েলের ছিলো সোফা, ড্রইংরুমের ফ্লোরই আমার খুব প্রিয় ছিলো,এমনি একটা বাসায় এক বন্ধুর বদান্যতায় আশ্রয়ের সন্ধান মিললো,বাসাটি ছোট জায়গাঁর উপর নির্মিত পৌনে এক কাঠার উপরে নির্মিত চারতলা বাড়ী,চারতলা বাড়ীর পুরাটাতেই একটা পরিবার থাকতেন ,প্রতি ফ্লোরে দুইটা করে রুম একটা বাথরুম।

কারামুক্তির পর মির্জা মাসুদ জুয়েল ও আমি


এমনি কোন একটি ফ্লোর সম্ভবত তিন তলায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো ,তিনতলা তারা ড্রইংরুম হিসাবেই ব্যবহার করতেন, ঐ ড্রইংরুমের ফ্লোরই হলো আমাদের বিছানা,রাত ১০-১১ টায় ঢুকতাম কোন রকম ঢুকে যেয়ে কাপড় চেন্জ করে শুয়ে পড়তাম খুব সকালে বের হয়ে যেতাম,তখন অনেকেই ঘুমে থাকতো,বের হয়ে কোনো হোটেলে নাস্তা খেয়ে কোথাও চলে যেতাম,এ ভাবে ২/৩ দিন গেলো আমরাও কিছুটা আশ্বস্থ হলাম যে আর যাই হোক রাতের একটা নিরাপদ আশ্রয়তো হলো,এই তথাকতিথ সুখ আর বেশীদিন রইলো না,তৃতীয় রাতে জানানো হলো বাসার ছোট মেয়েটির কাল জন্মদিন আমরা আমন্ত্রিত,আমরা বলতে আমি আর বন্ধু জুয়েল ,আমরা বললাম আমরা তো গভীর রাতে আসবো তাছাড়া কৌশলগত কারনেই মেহমানদের সামনে থাকা ঠিক হবে না,আমরা রাতে আসবো,ছাত্রজীবন তার উপর হুলিয়া ।

এই অস্বাভাবিক জীবনে পকেটে কতই বা টাকা থাকে তবুও প্রেজটিজ বলে কথা আমি আর জুয়েল পছন্দ করে মেয়েটির পড়ার টেবিলের জন্য একটা টেবিল ঘড়ি এবং মেয়ের জন্য একটা হাত ঘড়ি কিনলাম আর বাসায় যাওয়ার আগে জলখাবার মিস্টির দোকান থেকে চমচম নিলাম,বাসায় গিফ্ট নিয়ে উপস্থিত হওয়ায় খুব খুশী হলেন ,রাতে ঘুমাতে ঘুমাতে জানানো হলো পরের দিন বাসার বড় ভাইয়ার ম্যারেজ ডে,আমাদের দাওয়াত,দাওয়াত পেয়ে জুয়েল আমার দিকে অসহায়ের মত তাকিয়ে রইলো । 

যা হোক দাওয়াত বলে কথা পরের দিন কাঁটাবনে এলিগ্যান্টের একটা শার্টের দোকান ছিলো ওখান থেকে ভাইজানের জন্য একটা শার্ট আর ভাবির জন্য একটা হাত ঘড়ি সাথে মিস্টি নিয়ে বাসায় হাজির,ভাই শার্ট পেয়ে খুশী হলেও মনে হলো ভাবির প্রত্যাশা আরো বেশী কিছু ছিলো যা হোক ঘুমিয়ে পড়লাম পরের দিন রাতে আবার জানানো হলো বাসার মেজো মেয়ের জন্মদিন ঘরোয়া পরিবেশে পালন হবে, আমাদের জন্য এ তো দাওয়াত নয় যেনো যন্ত্রনা..বুয়েটের বন্ধু খোকনের কাছ থেকে টাকা ধার করে ড্রইংরুমের জন্য একটা দেয়াল ঘড়ি কিনলাম,কারন ড্রইংরুমে কোন ঘড়ি ছিলো না আর রসমালাই নিলাম,বাসায় সবাই খুশী।

বাসায় ঘুমের প্রস্তুতি নিতে নিতে জানানো হলো এই বাসায় সবাই মোহামেডান ক্লাবের সমর্থক ফুটবল খেলায় আজীবন প্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীর সাথে ফাইনাল খেলায় বিজয়ী হয়েছে সুতারং গ্রান্ড পার্টি হবে ,আমাদের কন্ট্রিবিউট করতে হবে,জুয়েল তো স্পস্টবাদী মুখের উপর কথা বলতে সে দেরী করতো না ।

জুয়েলকে যারা চিনতেন তারা জানেন, জুয়েল বললো আমি আবাহনী করি আমি কোন কন্ট্রিবিউট করতে পারবো না, মুলত জুয়েল দাওয়াতের অত্যাচারে অতিস্ট হয়েই এ প্রতিক্রিয়া,বাসার একজন জুয়েলকে বলে ফেললো আপনার চেহারা দেখেই বোঝা যায় যে আপনি আবাহনী করেন,শুরু হলো তুমুল তর্ক,আমি চুপই ছিলাম পরে জুয়েলকে থামালাম এবং বললাম আমরা টোটাল কন্ট্রিবিউট করবো এটা বলে পরিস্থিতি ঠান্ডা করা হলো বুঝতে আর বাকি রইলো না যে দাওয়াত নামের পরোক্ষ অত্যাচার করে আমাদের বাসার ড্রইংরুম থেকে বিতাড়িত করতে চেয়েছে,অথচ আমাদের তাদের সমস্যার কথা বললে নিশ্চয়ই আমরা আর যেতাম না,যা হোক পরের দিন খুব সকালে বের হয়ে আসলাম ,আর যাওয়া হয় নি ঐ বাসার ড্রইংরুমে। 
চরম বিপদে ঐ বাসার ড্রইংরুমে আশ্রয় পেয়েছি আজও তাদের মংগল কামনা করছি এবং পরম করুনাময়ের কাছে দোয়া করছি তাদের জন্য !

 

লেখক : এড. কামরুল ইসলাম সজল , সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ 

 

কিউএনবি/বিপুল/২৭ শে সেপ্টেম্বর ,২০১৭ ইং/দুপুর ১:৩৫