১৮ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ৮:৫৯

সৈয়দ শামসুল হকের আজ ১ম মৃত্যুবার্ষিকী

 

ডেস্ক নিউজ : আশিতম জন্মদিনের এক আয়োজনে সব্যসাচী কবি সৈয়দ শামসুল হক বলেছিলেন, ‘কবিতার ধ্বনি সংগীতে, নাটকের আলো আঁধার মঞ্চে, গল্পের অবিরাম বয়নে, এই দেশ ও মানুষের কথা বলে যাব।আর সোনার বাংলা স্বপ্নের বাংলা সংগ্রামী বৃহৎ বাংলার কথাবিতানে কথা আমি বলে গেলেও বিশ্বের সকল মানুষেরই কথন ও রচন তা হয়ে থাকবে, এই আমার সাধনা।’

সেদিনের সেই আয়োজনে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘চোখ মেলে চেয়ে আছি লালনের দিকে, তিনি একশ’ আঠারো বছর আয়ু পেয়েছিলেন। আমি অপার হয়ে সেই দীর্ঘ জীবনের দিকে তাকিয়ে আছি।’ কিন্তু সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক সেই দীর্ঘ জীবন পাননি।

এই কথাগুলো যেদিন বলেছিলেন তার বছর দেড়েক পরেই চিরতরে চোখ বুজলেন।

২০১৬ সালের এপ্রিলে তার ফুসফুস ক্যান্সার ধরা পড়ে। উন্নত চিকিৎসার জন্য লেখক গিয়েছিলেন লন্ডনের হাসপাতালে। সেখানে রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে পাঁচ মাস চিকিৎসা হয়।

২ সেপ্টেম্বর তিনি দেশে ফিরে আসেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইউনাইটেড হাসপাতালেই ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে জন্মভূমি কুড়িগ্রামে সরকারি কলেজের পাশে সমাহিত করা হয়।

সাহিত্যের সব ক্ষেত্রে বিচরণকারী সৈয়দ হক বেঁচেছিলেন ৮১ বছর (জন্ম ২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫, মৃত্যু ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬)। এই দীর্ঘ সময়ে দু’হাত ভরে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও গান লিখে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তার ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাস নিয়ে কয়েক বছর আগে ‘গেরিলা’ নামে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ।

তিনি যখন নিজে লেখার শক্তি হারিয়ে ফেলেন, তখন স্ত্রী কথাসাহিত্যিক ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হক করেছেন অনুলিখন। বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আদমজী সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার পেয়েছেন সব্যসাচী এ লেখক।

সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম প্রয়াণবার্ষিকীতে স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি। আজ বিকাল ৫টায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠান আয়োজন হবে।

জন্মভূমি কুড়িগ্রামে অযত্ন-অবহেলায় তার কবরখানি : কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আহসান হাবীব নীলু জানান, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ১ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তার মৃত্যুতে কুড়িগ্রামবাসী হারিয়েছে তাদের প্রিয় লেখককে। তার মৃত্যুবার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় পালনের জন্য কুড়িগ্রামে সর্বস্তরের মানুষ নানান প্রস্তুতি নিয়েছে।

সব্যসাচী এ লেখক জন্মভূমির টানেই শেষবারের মতো ফিরে আসেন কুড়িগ্রামে। তার প্রিয় কল্পিত জলেশ্বরীর বুকে চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে আছেন তিনি।

তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজে ধীরগতির কারণে এখনও অযতœ-অবহেলায় পড়ে রয়েছে তার কবরখানি। স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণসহ তার নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি সবার।

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের জন্ম কুড়িগ্রাম পৌর শহরের থানা পাড়ায়। তার বাবা মরহুম সিদ্দিক হক ছিলেন একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। শহরের ঐতিহ্যবাহী জাহাজ মোড়ে তার মায়ের নামে ছিল নূরজাহান মেডিকেল হল। সব্যসাচী লেখক ৫ ভাই আর ৩ বোনের মধ্যে সবার বড়। মেধাবী শামসুল হককে এলাকার মানুষ বাদশা নামে ডাকতেন।

তিনি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত রিভার ভিউ উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে ঢাকায় পাড়ি জমান। কুড়িগ্রামে তার ছোট ভাই অ্যাডভোকেট আজিজুল হক পরিবার নিয়ে এখানেই থেকে যান।

জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ রাশেদুজ্জামান বাবু জানান, কুড়িগ্রাম তথা দেশের কৃতী সন্তান দেশবরেণ্য সব্যসাচী লেখক সৈয়দ হকের ১ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে নানা অনুষ্ঠান ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান জানান, সব্যসাচী লেখকের ১ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মিলাদ মাহফিল, শোক র‌্যালি এবং তার আত্মজীবনী নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

এ ছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণের নকশা প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার পথে এটি হয়ে গেলেই দ্রুত তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি একেএম সামিউল হক নান্টু জানান, সৈয়দ হক আর আমি কুড়িগ্রাম রিভার ভিউ স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলাম। আমি ছিলাম ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে আর উনি ছিলেন ৮ম শ্রেণীতে।

ভীষণ দুরন্ত ছিলেন সৈয়দ হক। সৈয়দ হক মেট্রিক পাস করে বাড়ি থেকে পালিয়ে মুম্বাই যান সিনেমা জগতে কাজ করতে। বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকবেন এ মানুষটি।

কুড়িগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন জানান, মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার এ মানুষটি বিভিন্ন মাধ্যমে অনর্গল লিখে গেছেন।

তার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নুরুল দিনের সারা জীবনসহ অনেক অমর সাহিত্যের স্রষ্টা তিনি। তার ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’ আওয়াজ তোলে নিপীড়িতদের প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। তার লেখা অসংখ্য কবিতা, উপন্যাস আর নাটকের মধ্য দিয়ে তিনি কুড়িগ্রামকে তুলে ধরেছেন বিশ্ব সাহিত্যে।

কিউএনবি/রেশমা/২৭ শে সেপ্টেম্বর ,২০১৭ ইং/সকাল ১১:৩৬