২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৩:৪১

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে প্রথম বরগুনায় সশস্ত্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ

বিশেষ প্রতিবেদন: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কেন বাঙালি জাতী বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে রাস্তায় বেরিয়ে আসেনি। কেন হাজার হাজার মানুষ সেনানিবাস ঘেরাও করেনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকবাহিনী হত্যার প্রতিবাদে যে জাতি বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল সে জাতি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নীরব ছিল।

কেন হাজার হাজার আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও মুক্তিযোদ্ধারা হত্যাকারীদের প্রতিরোধ করেনি। ১৯৭৫ আমি বরগুনা মহকুমার এসডিও। আমার নির্দেশে বরগুনা রক্ষিবাহিনী, পুলিশ, মুক্তিবাহিনী হত্যা কারীদের বিরুদ্ধে স্বসস্ত্র বিদ্রোহ করেছিল।

১৫ আগস্ট সকাল ৭:৩০ মিনিটে বরগুনা ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল মোতালেব মৃধা আমার কক্ষে প্রবেশ করে চিৎকার দিয়ে বলে, স্যার বঙ্গবন্ধু নাই। বেতারে আমি মেজর ডালিমের কণ্ঠে শুনলাম তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। আমি সাথে সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম এই বলে, This is the end of my life আমার জীবনের এই শেষ।

আমি জানতাম সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করলে মৃত্যু নিশ্চিত। সেদিন বরগুনার ছাত্রলীগ নেতা সিদ্দিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর কবীর, আব্দুর রশিদ, বাকশাল নেতা এডভোকেট নুরুল ইসলাম শিকদার, এ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন, কমিউনিস্ট পার্টির কাজী মানিক প্রমুখ আমার সাথে বিদ্রোহে যোগ দেন। বরগুনা মহকুমার পুলিশ অফিসার ফারুক, তার পুলিশ বাহিনী নিয়ে আমাকে মর্থন দেন। আমি রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্পে ছুটে যাই। তাদেরকে অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে বলি। ঘোষণা করলাম যারা ডালিম ফারুকের শামরিক সরকারের পক্ষে মিছিল করবে তাদের গুলি হত্যা করে খাকদন নদীতে ফেলে দেওয়া হবে।

আমার হাতে তখন রিভলবার ছিল। ১৫ আগস্ট সকালেই পটুয়াখালীতে অবস্থানরত রক্ষিবাহিনীর লিডারকে বিদ্রোহ করে পটুয়াখালী পুলিশ লাইন দখল নিতে বলি। তারা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঢাকার সাথে যোগাযোগ করে। দুঃখের বিষয় ঢাকা থেকে নির্দেশ তারা পায়নি।

আমার অফিসে শক্তিশালী একটি বেতার যন্ত্র ছিল। আমি এই বেতর যন্ত্র দিয়ে বাংলাদেশের ঢাকা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, সিলেট চট্টগ্রাম প্রভৃতি স্থানে যোগাযোগ করে হতাশ হলাম। সব জায়গা থেকে আনন্দের শব্দ ভেসে আসে। আমি হতাশ না হয়ে দপ্তরে বসে সিদ্ধান্ত নিলাম, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি লোক যদি বঙ্গবন্ধু হত্যার স্বাগত জানায় তা হলেও আমি একাই বিদ্রোহ করব। সে দিন আমার কোন কান্না ছিল না, ভয় ছিল না, প্রচণ্ড সাহস ছিল। আমি গর্বিত যে আমার আহ্বানে বরগুনার রক্ষীবাহিনী, পুলিশ বিদ্রোহ করেছেলেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন। বরগুনার ৫টি থানায় পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে তাদের অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলি। আমরা সামরিক সরকারকে মানি না। তাদের প্রতিরোধ করব। বাংলাদেশ বেতার থেকে বার বার ঘোষণা করা হচ্ছে, সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয়েছে, সামরিক আইন জারি হয়েছে। আমি তখন বরগুনা মহকুমায় কারফিউ ও সামরিক আইন জারি করি নাই। আমার বিশ্বাস ছিল সামরিক বাহিনীর, পুলিশ-জনতা বিদ্রোহ করে হত্যাকারীদের গ্রেফতার করবে। কিন্তু কোন সাড়া নেই।

১৫ আগস্ট ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ পটুয়াখালীর ডিসিকে ফোন করে জেলার পরিস্থিতি জানতে চান। খুনিরা খন্দকার মোস্তাক আহম্মেদকে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করেছে। মন্তিসভা গঠন করেছে। ১৬ আগস্ট সকালে মন্ত্রিসভার সদস্য, মন্ত্রী নুরুল ইসলাম মঞ্জু পটুয়াখালী ডিসির সাথে আলোচনা করে পরিস্থিতি জানতে চায়। বরগুনায় আমি বিদ্রোহ করেছি এ সংবাদ জেনে তিনি বারবার ডিসিকে বলেন, তিনি আমার কাথে কথা বলবেন। ডিসি আমাকে কথা বলতে বলেন। ডিসিকে আমি বলাম, আমি মোস্তাক সরকারের মন্ত্রীর সাথে কথা বলব না। বারবার অনুরোধের পর আমি টেলিফোন ধরলাম।

নূর ইসলাম মঞ্জু বরগুনার পরিস্থিতি জানতে চান। আমি কোন উত্তর না দিয়ে টেলিফোনটি আমার পাশে বসা আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি এ্যাডভোকেড নুরুল ইসলাম শিকদারকে দেই। তিনি চিৎকার দিয়ে কেদে বললেন মঞ্জু ভাই বঙ্গবন্ধু নাই। মঞ্জু মিয়া তাকে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করেন। বরগুনায় আমরা বিদ্রোহ করে আমি বরগুনা জেলার সংসদ সদস্য আসমত আলী শিকদার, মন্ত্রী শাহাজাদা আব্দুল মালেক খান এমপি, নিজামউদ্দিন তালুকদার এমপির সাথে যোগাযোগ করি। তারা আমাকে পুরা সমর্থন জানান।

শাহজাদা আব্দুল মালেক খান বলেন যে, খোন্দকার মোস্তাক তার আপন ভায়রা। মোস্তাক সাহেব তাকে মন্ত্রিসভায় যোগা দেয়ার জন্য বারবার চাপ দিচ্ছেন। তিনি বলে দিয়েছেনÑ ভাইসাব আমি বঙ্গবন্ধুর রক্তের উপর পাড়া দিয়ে আপনার মন্ত্রীসভায় যোগ দিতে পারি না। তার কথা শুনে শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে। এমন মহাপুরুষ বাংলাদেশে বিরল।


১৫ আগস্ট বিকেল থেকে শত শত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধারা আমতলি, পাথরঘাট, বামনা, বেতাগী থানা থেকে বরগুনায় আসতে থাকে। তারাও আমার সাথে বিদ্রোহে যোগ দেয়। ১৬ আগস্ট বরগুনা মহকুমা অফিসের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। বিকেলে আমার বাসায় শোক সভা ও মিলাদ অনুষ্ঠিত হয়। শোক সভায় উপস্থিত ছিলেন বরগুনা আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল লতিফ মাস্টার, স্বেচ্ছাসেবক লীগ প্রধান ইউনুছ শরীফ, সার্কেল অফিসার ফরিদউদ্দিন আহম্মেদ, ত্রাণ কর্মকর্তা বিপ্লব শর্মা, সাবরেজিস্ট্রার আজগর আলী, এসডিপিও ফারুক ছাত্রলীগ নেতা ছিদ্দিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর কবির, এম এ রশিদ, দীলিপ প্রমুখ। আমরা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তাদের আÍার শান্তি কামনা করি।


চিফ অব স্টাফ শফিউল্লাহর পরিবর্তে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি মাঠ পর্যায় সকল রক্ষীবাহিনীকে তাদের অস্ত্র স্ব স্ব জেলা প্রশাসক ও এসপির নিকট জমা দিতে বলে। পটুয়াখালী রক্ষীবাহিনী ডিসিএসপির নির্দেশের জবাবে বললেন, তারা বরগুনার এসডিওর নির্দেশ ছাড়া অস্ত জমা দেবে না। এ সময় যশোর সেনানিবাসের জিওসি ছিলেন ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলী। তিনি বরগুনার বিদ্রোহের কথা শুনে নির্দেশ দিলেন আমার ডেডবডি নিয়ে যাওয়ার জন্য। এ সময় খুলনার কমিশনার তার কাছে ছিলেন। তিনি বললেন, বরগুনার এসডিওর বিষয়টি আমাকে দেখতে দেন।

সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ বরগুনা রক্ষিবাহিনী সহকারী লিডার আব্দুল মান্নানকে নির্দেশ দেন যে, তারা যেন আমাকে পিছন থেকে গুলি করে হত্যা করে। কিন্তু শত শত জনতা ভয়ে তাদের পক্ষে কোন পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব ছিল না। তা ছাড়া রক্ষীবাহিনী ও পুলিশ আমাকে সমর্থন দিয়েছে। আমি পটুয়াখালী রক্ষীবাহিনী লিডারকে নির্দেশ দিলাম যে, তারা যেন অস্ত্র পটুয়াখালীতে জমা না দিয়ে সরাসরি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে চলে যান। এ সময় একটি গুজব ছিল যে, রক্ষীবাহিনীদের মেরে ফেলা হবে। আমি আমার লঞ্চে বরগুনা রক্ষিবাহিনীদের পটুয়াখালী পাঠিয়ে দেই। সেখান থেকে তারা ঢাকায় চলে যায়। ইতিমধ্যে পুলিশ বরগুনার রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্রলীগ নেতাদের গ্রেফতার শুরু করে। আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।


১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। এ সংবাদ বরগুনায় ৫ নভেম্বরে পৌঁছে। আমি তখন বরগুনায় ছিলাম। আমি আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পাটি ও ছত্রনেতাদের নিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম যে, ৬ নভেম্বর বরগুনায় সর্বাÍক হরতাল পালিত হয়। বাংলাদেশে একমাত্র জেল হত্যার প্রতিবাদে বরগুনায় হরতাল পালিত হয়।

কিউএনবি/রিয়াদ /১৪ই আগস্ট, ২০১৭ ইং / সন্ধ্যা ৬:৩০