২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ১১:২৬

চট্রগ্রাম উপকূলে ভরা মওসুমেও সাগরে ইলিশ নেই

 

ডেস্কনিউজঃ চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল দেখা দিয়েছে। সাগর থেকে অনেকটা খালি হাতে ফিরছে জেলেরা। ভরা মৌসুমে ইলিশ না পাওয়ায় চরম দুর্ভোগ পৌহাতে হচ্ছে জেলে পরিবারগুলোর। উপজেলারচট্রগ্রাম উপকূলে উপকূলীয় এলকায় গিয়ে জেলেদের সাথে কথা বললে তারা তাদের এসব দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। 
সাহেরখালী ইউনিয়নের ডোমখালী এলাকার জেলে সবুজ জলদাশ বলেন, ‘প্রতি বছর এদিনে আমরা মোটামুটি ভাল থাকি। কারণ এসময় সাগরের ধরা পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। কিন্তু এবার তার বিপরিত । ইলিশ মৌসুম অনেকটা চলে গেলেও এখনো আমাদের জালে ইলিশ আসছেনা।’ শুধু সবুজ নয় এ ধরনের কথা বললেন সাহেরখালী বেড়িবাঁধে উপস্থিত হারাধন জলদাশ, বিকাশ জলদাশ, শুকলাল জলদাশ, অমলেন্দু জলদাশসহ অনেকে।

তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত জুন থেকে আগষ্ট এই তিন মাস জেলেদের জন্য বহু কাংখিত। মূলত বর্ষার এই তিন মাসের দিকে তাকিয়ে জেলেরা সারাবছর প্রহর গুনে। কারণ, এসময় সমুদ্রে প্রচুর ইলিশের দেখা মেলে। আর এই ইলিশ বিক্রির অর্থ দিয়েই চলে জেলেদের সারাবছরের সংসার। প্রাচীন কাল থেকে এটিই রীতি হলেও বিগত কয়েক বছর ধরে সাগরে ইলিশ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। ফলে ঘোর ইলিশ মৌসুমেও সাগর থেকে খালি হাতে ফিরছে জেলেরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভরা মৌসুমেও মিরসরাইয়ে রূপালী ইলিশের বড় আকাল চলছে। জেলেরা জীবন বাজি রেখে ইলিশের প্রধান উৎস্য বঙ্গোপসাগরের গভীরে গিয়ে পর্যাপ্ত ইলিশ পাচ্ছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খালি হাতে তাদেরকে ফিরতে হচ্ছে। আর কখনো কখনো অল্প কয়েকটি ইলিশ ধরা পড়লেও এক সাথে সাগরে যাওয়া একদল জেলে ভাগে পড়ছে সামান্য কয়েকটি করে। আর দিনের পর দিন এ অবস্থা চলতে থাকায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। 
এসসময় উপজেলার হাটবাজারে ইলিশে ভরা থাকার কথা। কিন্তু তবু ও ইলিশের দেখা মিলছে না। নামে মাত্র সামান্য ছোট ইলিশ দেখা গেলে অপ্রতুলতার জন্য আকাশ ছোঁয়া দাম। তাই কিনতে পারছে না সাধারণ মানুষও। আবার ভরা মৌসুমেও এ হাহাকার বিপদে ফেলেছে জেলেদের। ঋণ করে ইলিশ শিকার ও ব্যবসায় যারা নেমেছেন, তাদের দিন দিন সুদ বাড়ছে। অন্যদিকে বাকিতে রসদ কিনে সময়মতো শোধ করতে না পেরে দেনায় ডুবছেন জেলেরা। অবশ্য এ নিয়ে জেলেদের বিচলিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে মৎস্য বিভাগ। কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইলিশের মৌসুম কিছুটা পিছিয়ে গেছে। আরো কয়েক দিন পর নদীতে ইলিশের পরিমাণ বাড়তে পারে।

সরেজমিনে উপজেলার বড়দারোগারহাট, বড়তাকিয়া, হাদি ফকির হাট, মিরসরাই সদর, মিঠাছড়া বাজারে গিয়ে ইলিশের আকাল পরিলক্ষিত হয়েছে। বড়দারোগাহাট ও মিঠাছড়া বাজারে ইলিশ দেখা গেলেও তা আকারে ছোট এবং মাঝারী। বড় আকৃতির কোন ইলিশই চোখে পড়েনি।

বড়দারোগারহাটের মাছ প্রবীণ বিক্রেতা হরি জলদাশ বলেন, ইলিশের কথা উঠলে বড় দুঃখ লাগে। এই মৌসুমে আমরা শুধু ইলিশ বিক্রি করেই চলতাম। মাত্র ১০-১২বছর আগেও এই সময় সাগর পাড়ে ইলিশের ছড়াছড়ি ছিলো। দাম খুব হওয়ায় জেলেরা অনেক সময় বাজারেও আনতে চাইত না মাছ। আমরা সাগর উপকূলে গিয়ে একমন ইলিশ ২-৩শ টাকায়ও কিনেছি। তার পর বাজারে এক কেজি ১০টাকা। কখনো কখনো আরো কম কিংবা পঁচে গেলে ৪-৫টি পঁচা ইলিশ ১০-১৫ টাকায় বিক্রি করতাম। কিন্তু এখন ইলিশ দূর্লভ হওয়ায় জাটকা আকৃতির ইলিশ আড়াই থেকে তিন’শ টাকা এবং মাঝারি সাইজের ইলিশ ৪-৫’শ টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া বড় ইলিশ তো কেজি ৭-৮’শ থেকে এক হাজারের উপরে বিক্রি হয়।

হাদি ফকিরহাট বাজারের ব্যবসায়ী আলী মিয়া বলেন, এখানে ইলিশ না থাকায় তিনি চট্টগ্রামের ফিশারী ঘাট থেকে ইলিশ এনেছেন বিক্রির জন্য। একসময় যে ইলিশ এখান থেকে অন্যত্র যেত এখন সেই ইলিশ অন্য জায়গা থেকে আনতে হওয়ায় ক্রেতারা বিস্মিত। মিরসরাই সদর বাজারে গত কয়েকদিন ধরে ইলিশের সন্ধানে ঘুরতে থাকা এক ক্রেতা আনোয়ার হোসেন সুমন জানান, বারবার বাজারে গিয়েও তিনি ইলিশ পাননি।

জেলেরা বলছেন, গত বছরের এ সময় ইলিশের পরিমাণ কিছুটা কম থাকলেও এখনকার মতো এত কম নয়। গত বছর নদীতে গিয়ে কোনো জেলেকেই খালি হাতে ফিরতে হয়নি। আর এখন সারা দিনে এক হালি-দেড় হালি মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে খালি হাতে ফিরছেন। তাছাড়া নদীর বিভিন্ন স্থানে পলি জমে দেখা দিয়েছে নাব্য সংকট, ডুবোচর, কমে গেছে পানির প্রবাহ, ময়লা-আবর্জনায় নদী দূষণসহ নানা কারণে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে আসছে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

নদীর বিভিন্ন স্থানে ইলিশের অভয়াশ্রমগুলোয় চর জেগে ওঠায় ইলিশ চলে যাচ্ছে সাগরে। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রবাহে ইলিশের সময়টা অনেক পিছিয়ে গেছে।

এ বিষয়ে মিরসরাই উপকূলীয় জেলে সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হরিলাল জলদাশ বলেন, ঘোর মৌসুম হলেও বঙ্গোপসাগরের মিরসরাই-সন্দ্বীপ চ্যানেলে পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। এরপরও তারা আশা ছাড়েননি। আগামী পূূর্নিমার জোঁ-তে হয়ত এই আকালের অবসান হবে এমনই প্রত্যাশা তাদের। ইলিশের এই আকালের কথা স্বীকার করেন, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমানও।

তিনি বলেন, ইলিশের ভরা মৌসুম হলেও এখন আগের মত সাগরে ইলিশ ধরা পড়ছে না। পাশাপাশি আবাহাওয়া খারাপ হওয়ায় জেলেরা গভীর সমুদ্রে যেতে পারছে না। এসবের কারণে বর্তমান হাটবাজার ইলিশ শূণ্য হলেও খুব শীঘ্রই প্রচুর ইলিশ ধরা পড়তে পারে বলে জেলেদের মত তিনিও আশা প্রকাশ করেন।

 

কিউএনবি/বিপুল/২১শে জুলাই, ২০১৭ ইং/  বিকাল ৩:২৮