১৭ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩রা পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সন্ধ্যা ৭:১৭

রাবি শিক্ষককে কুপিয়ে হত্যা: প্রতিবাদে বিক্ষোভ-মানববন্ধন

রাবি থেকে আব্দুর রহমান আশিক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষককে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজশাহী মহানগরীর শালবাগানের বটতলা এলাকায় ওই শিক্ষকের বাসা থেকে ৫০ গজ দূরে তাকে হত্যা করা হয়। নিহত শিক্ষকের নাম এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকী।

এদিকে শিক্ষক হত্যাকা-ের প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা, প্রগতিশীল ছাত্রজোট এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। এ ছাড়াও শিক্ষক হত্যাকা-ের ঘটনায় বিভিন্ন সংগঠন নিন্দা জানিয়েছে।

বোয়ালিয়া থানার ওসি শাহদাত হোসেন বলেন, ঘটনাস্থল থেকে ৫০ গজ দূরে প্রফেসর রেজাউলের বাড়ি। তাকে হত্যার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। কোনো জঙ্গি সংগঠন এ হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, হত্যাকা-ের পরই প্রতিবেশীরা মোটরসাইকেলের শব্দ শুনেছেন। ওই মোটরসাইকেলে ২ থেকে ৩ জন যুবক ছিলো বলে ধারণা করছেন তারা। খুনিরা প্রফেসর  সিদ্দিককে হত্যার পর মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।

রেজাউল করিম সিদ্দিকীর গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায়। তার স্ত্রী হোসনে আরা শিলা গৃিহণী। তার দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে রিয়াসাত ইমতিয়াজ সৌরভ রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র এবং মেয়ে রেজোয়ানা হাসিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী।

নিহত রেজাউল করিমের ভাই ও নাটোরের সিংড়া থানার শিক্ষা কর্মকর্তা সাজিদুল করিম সিদ্দিকী বলেন, সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭টা ৪০ মিনিটের বাস ধরতে রেজাউল করিম বাসা থেকে বের হন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই বাসা থেকে একটু দূরে আরেকটি বাসার মেইন গেটের সামনে তার গলা কাটা লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। ভাই রেজাউল করিমসহ তারা ২৬১ শালবাগান (সপুরা) এলাকায় পৈতৃক বাড়িতে একসঙ্গে বাস করতেন বলেও জানান সাজিদুল করিম। তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার দরগাবাড়ি এলাকায়। তার ভাইকে কেউ কখনও কোনো ধরনের হুমকি দিয়েছিল কি না, তা জানাতে পারেনি সাজিদুল করিম।

প্রফেসর রেজাউল করিমের স্ত্রী হোসনে আরা বলেন, ‘ভালো মানুষ বাসা থেকে বের হয়ে গেল। এরপর রাস্তার মধ্যে খুন হলো। তাকে কে বা কারা খুন করলো? তার তো কোনো শক্র ছিল না। কারো সঙ্গে তার কোনো ঝামেলাও ছিল না।’

প্রফেসর রেজাউল করিম ‘কোমলগান্ধ্যা’ নামে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক পত্রিকা সম্পাদন করতেন। তিনি ভালো সেতার বাদক ছিলেন। এছাড়াও তিনি ‘সুন্দরম’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের উপদেষ্ঠা ছিলেন।

‘সুন্দরম’ সংগঠনের সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখার সেকশন অফিসার হাসান রাজা বলেন,‘ তিনি একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন। তিনি যে ধরনের লেখালেখি করতেন তা খুবই সাধারণ। আমরা যতটুকু জানি তার গ্রামের বাড়িতে জমিজমা নিয়ে সেখানকার কিছু লোকের সঙ্গে ঝামেলা ছিল। এ ঘটনার জেরে এ হত্যাকা- ঘটে থাকতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও একই বিভাগের সহকর্মী ড. মো. শহীদুল্লাহ্ বলেন, ‘প্রফেসর রেজাউল সিদ্দিকীর মতো একজন নিরীহ মানুষ এভাবে হত্যার শিকার হতে পারে তা ভাবা যায় না। একের পর এক শিক্ষক হত্যার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যেন বদ্ধভূমিতে পরিণত হয়েছে। আমরা আর কোনো শিক্ষকের লাশ দেখতে চাই না। এসময় তিনি দ্রুত এ হত্যাকা-ের বিচারের জন্য প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

তিনি আরও বলেন, যতদিন এ হত্যাকা-ের বিচার না হবে ততদিন আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো। আমরা শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় র‌্যালি ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবো। সেই সঙ্গে রোববার ক্লাশ বর্জন করা হবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি।

এ হত্যাকা-ের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষককে একের পর এক হত্যা করা হচ্ছে। ড. ইউনূস, ড. তাহের, ড. শফিউলের পর সর্বশেষ ড. সিদ্দিকীকে হত্যা করা হলো। এর মাধ্যমে একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় যেমন মেধাবী শিক্ষকদের হারাচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষকদের এই নিরাপত্তাহীনতা দূর করা দরকার। এজন্য সরকাররের বিভিন্ন সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কাজ করে এর পেছনে দায়ীদের খুঁজে বের করতে হবে।’

সরেজমিন ঘটনাস্থল : সকাল ৯টার দিকে সরেজমিন হত্যাকা-স্থলে গিয়ে দেখা যায় রাজশাহী মহানগরীর শালবাগানের বটতলা এলাকায় রেজাউল সিদ্দিকীর বাড়ি থেকে ৫০ গজ দূরে একটি গলির মধ্যে দুর্বৃত্তরা তাকে গলা কেটে হত্যা করে ফেলে রেখেছে। মরদেহের আশেপাশে রক্ত ছিটিয়ে পড়ে আছে। আশেপাশের লোকজন জানান, ওই শিক্ষক সকাল সাড়ে সাতটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে হেলমেট পরা দুইজন মোটরসাইকেল আরোহী তার ঘাড়ে চাপাতি দিয়ে কোপ দিয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ, গোয়েন্দা, র‌্যাব ঘটনাস্থল ঘিরে রাখে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

ইংরেজি বিভাগের বিক্ষোভ : এদিকে, অধ্যাপক রেজাউল সিদ্দিকী হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ কলা ভবনে বিভাগের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে সিনেট ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুলাহ আল মামুন বলেন, তিনি রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না, সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমরা এ হত্যাকা-ের প্রতিবাদ জানিয়ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।

শিক্ষক সমিতির প্রতিবাদ সমাবেশ: ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হত্যার ঘটনায় বেলা সোয়া ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। সমাবেশে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মার্কেটিং বিভাগের প্রফেসর ড. মো. শাহ্ আজমের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন, শিক্ষক সমিতির সভাপতি ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর ড. মো. শহীদুল্লাহ, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুলাহ আল মামুন, শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি প্রফেসর ড. আনন্দ কুমার সাহা, সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোহা. রেজাউল করিম, আইন বিভাগের প্রফেসর ড. হাসিবুল আলম প্রধান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. এএইচএম মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।

প্রগতিশীল ছাত্রজোটের বিক্ষোভ: এদিকে এ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে বেলা সাড়ে ১১টায় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে প্রগতিশীল ছাত্রজোট। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ কলা ভবনের সামনে থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে।

রাবি শিবিরের নিন্দা: শিক্ষককে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যাকান্ডের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাবি শিবিরের সভাপতি শোয়েব শাহরিয়ার, সেক্রেটারী হাসান তারিক ও সাংগঠনিক সম্পাদক লাবিব আবদুল্লাহ।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, প্রতিটি হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পরিকল্পিতভাবে প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করার জন্য বা তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ঘটনার পর পরই নান ধরণের অপপ্রচার ও প্রপাগান্ডা চালানো হয়। যদিও পরবর্তীতে সুষ্ঠু তদন্তে প্রকৃত অপরাধীরা চিহ্নিত হয়। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টসহ জনসাধারণের ভিতর এক ধরণের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে তাই ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাবি শাখা এ নৃশংস হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিগত সকল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের দ্রুত শাস্তির দাবী জানাচ্ছে।এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, রাবি শাখা ছাত্রশিবির ছাত্র ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতি জোট, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়াছি।

দাফন: রাবি শিক্ষক এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীর জানাযা বাদ আসার বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। পরে তার নিজ গ্রামের রাজশাহীর বাঘমারায় দরমারিয়া গ্রামে নিজ বাসভবনে বাদ ইশা দাফন করা হবে।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর বিকালে খুন হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর কে এম শফিউল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন চৌদ্দপাই এলাকায় নিজ বাসার সামনে দুর্বৃত্তদের হামলা খুন হন তিনি। এরও বেশ আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও দুজন শিক্ষক খুন হন। ২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ভোরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় প্রাতর্ভ্রমণের সময় কুপিয়ে হত্যা করা হয় অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসকে। ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আবাসিক এলাকা থেকে নিখোঁজ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর এস তাহের। দুই দিন পর ক্যাম্পাসের বাসার পাশের ম্যানহোলের ভিতরে তার লাশ পাওয়া যায়।

কুইক নিউজ বিডি.কম/এএম/২৩.০৪.২০১৬/২১:০৬