১৮ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ৮:২২

দীর্ঘ ১৯ বছর পর স্থায়ী ঠিকানা পেল আফরিদা

গোপালগঞ্জ থেকে এম শিমুল খান: নাম পরিচয় ও ঠিকানাহীন আফরিদা অবশেষে স্থায়ী ঠিকানা পেয়েছে। মহা ধুমধামের সঙ্গে তাকে স্বামীর বাড়ি পাঠালো গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া উপজেলা প্রশাসন ও সমাজ সেবা অধিদপ্তর।

আফরিদার জীবনের ১৯টি বছর কেটেছে বিভিন্ন বেবি হোম, শিশু সদন ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে। আফরিদা খাতুন নামে এ মেয়েটির এক বছর বয়সে ঠাঁই হয়েছিলো রাজশাহীর বেবি হোমে। ৬ বছর বয়সে তাকে পাঠানো হয় নওগাঁ শিশু পরিবারে। সেখান থেকে যশোর শিশু পরিবার হয়ে গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া শেখ রাসেল দুঃস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে।

মেয়েটি নিজের বাবা-মায়ের নাম কিছুই জানে না। দেখতে দেখতে বছর পেরিয়েছে। শিশু থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবনে পা দেয় আফরিদা। তাকে সঠিক জায়গায় পুনর্বাসনের জন্য সমাজ সেবা অধিদপ্তর ও টুঙ্গীপাড়া উপজেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেয়। তারই অংশ হিসেবে অন্য দশটি বিয়ের মতো সব অনুষ্ঠানিকতা করেই বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়। তার বিয়েতে সবই দেয়া হয়েছে পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে।

গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক খলিলুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দুই লাখ টাকা দেনমোহর কাবিন লেখা হয়। অনুষ্ঠানে মেয়ের উকিল বাবা হন পুনর্বাসন কেন্দ্রের হাউজ প্যারেন্ট মোঃ কামরুজ্জামান ঠাকুর। বিয়ে পড়ান মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম। এ বিয়ে অনুষ্ঠানে উপহার সামগ্রী দিতে কোনো কিছুর কমতি রাখেনি প্রশাসন। কালার টিভি, ফ্রিজ, ডিনারসেট, সেলাই মেশিন, মুদি দোকানের মালামাল সামগ্রীসহ অন্যান্য গৃহস্থলী পণ্য।

আফরিদা খাতুনের বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে শেখ রাসেল দুঃস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র সেজে ছিল নানা রঙের পতাকায় আর লাল-নীল-বেগুনী রঙের কাগজ কেটে রশিতে টানিয়ে সাজানো হয় পুরো পুনর্বাসন কেন্দ্রটি। গাঁয়ে হলুদ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিন-ভর চলে নানা আনুষ্ঠানিকতা। পুনর্বাসন কেন্দ্রটির তিন’শ নিবাসী নতুন আনন্দে মেতে ওঠে। সাউন্ড বক্স বাজিয়ে নেচে-গেয়ে আনন্দ-উল্লাস আর হই চই করে তারা। শেষ বিকেলে নতুন দম্পতিকে স্থানীয় রীতিতে দুধ-ভাত খাইয়ে সব অনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বিদায় জানানো হয়।

আফরিদা খাতুনকে বিয়ে দেয়া হয় সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের নাফিউর আসাদ রুবেলের সঙ্গে। সে একজন মুদি দোকানি। বিয়ে অনুষ্ঠানে প্রায় ৫০০ লোক খাওয়ানো হয়। খাদ্য তালিকায় ছিলো কাচ্চি বিরানী, মুরগীর রোস্ট, ডিম, দই, মিষ্টি ও কোমল পানীয়। অনুষ্ঠানে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো: খলিলুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোমিনুর রহমান, টুঙ্গীপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার শফিউল্লাহ, সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সমীর মল্লিক, ওই প্রতিষ্ঠানের সহকারী পরিচালক ফারহানা নাসরিনসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার বরের এলাকার স্থানীয় জন প্রতিনিধি ও নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

কনে আফরিদা তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে  অশ্রু সিক্ত হয়ে তার দাম্পত্য জীবনে সবার দোয়া ও আশির্বাদ কামনা করে। আফরিদার স্বামী নাফিউর আসাদ রুবেল তার স্ত্রীকে নিয়ে আগামী দিনে একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখার অঙ্গীকার করে বলেন, সে (আফরিদা) জীবনে কিছুই পাইনি। না ছিলো কোনো পরিচয়, না ছিলো কোনো সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। আমি ওকে একটি নতুন স্থায়ী ঠিকানা দিব, সেখানে সে সুখে থাকবে, ভাল থাকবে।

গোপালগঞ্জ জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সমীর মল্লিক বলেন, আরো দশটি মেয়ের যেমন বিয়ে হয়, আমরা তেমন অনুষ্ঠানিকতা করে তার বিয়ে দিয়েছি। আমরা আনুষ্ঠানিকতার কমতি রাখিনি। যাতে সে মনে না করে তার মা-বাবা নেই।

টুঙ্গীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শফিউল্লাহ বলেন, টুঙ্গীপাড়া উপজেলা প্রশাসন ও সমাজ সেবা অধিদপ্তর মেয়েটির একটি নতুন ঠিকানা দিতে পেরে আনন্দিত। এই নতুন দম্পতি যাতে সুখে থাকে সে জন্য আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। আগামীতেও আমরা খবর রাখবো ও সব ধরনের সহযোগিতার চেষ্টা করব।

কুইক নিউজ বিডি.কম/এএম/১১.০৪.২০১৬/২০:২৫