২৩শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | রাত ৯:২৫

অর্থ উপার্জনে ইসলাম যেভাবে অনুপ্রেরণা যোগায়

 

ডেস্ক নিউজ : জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন মানুষের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় জীবনের সঙ্গেই জড়িত। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি একটি দেহ হয়, তবে প্রতিটি মানুষ একটি অঙ্গ। সুতরাং ব্যক্তি ও সমাজ পরস্পর দ্বারা প্রভাবিত হয়। ইসলামী জীবনব্যবস্থায় ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যকার সম্পর্ক কী, তা নির্ণয় করতে চাইলে তিনটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে—ক. উপার্জন কিভাবে করে? খ. কিভাবে খরচ করে? গ. কার জন্য খরচ করে? অর্থাৎ সে কিভাবে আয় করে? এই আয়কে কী বৈধ বলার সুযোগ আছে? উপার্জিত সম্পদ কোথায় ও কিভাবে খরচ করবে?

আর্থিক জীবনের চার দিক

ইসলাম এই তিনটি প্রশ্নের সমাধানে মানুষের ব্যক্তিগত আর্থিক জীবনকে চারভাগে ভাগ করেছে। প্রথম ভাগে মানুষকে চেষ্টা-শ্রমের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং তাকে উপার্জনে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে উপার্জনের মূলনীতি ও বিধি-বিধান শেখানো হয়েছে। তৃতীয় ভাগে ব্যয়ের মূলনীতি ও নিয়ম শেখানো হয়েছে। চতুর্থ ভাগে কোথায় ব্যয়ের খাতগুলো দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে।

১. উপার্জনের অনুপ্রেরণা : ইসলাম মানুষের জীবন-জীবিকার সমস্যা সমাধানের জন্য সর্বপ্রথম উপার্জনে উদ্যোমী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কোরআন ও হাদিসে নানাভাবে মানুষ জীবিকার অনুসন্ধানে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন নামাজ আদায় শেষে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অনুসন্ধান কোরো।’ (সুরা জুমা, আয়াত : ১০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ফজরের নামাজ আদায়ের পর জীবিকার সন্ধান না করে তোমরা ঘুমিয়ে থেকো না।’ (কানজুল উম্মাল, হাদিস : ৪১৬৮)

২. উপার্জনের মূলনীতি : একজন মানুষ যখন উপার্জনে অনুপ্রাণিত হয়, তখন উপার্জনের ক্ষেত্রে মানুষ স্বেচ্ছাচারী হতে পারবে না। যেকোনো উপায় ও পদ্ধতিতে অর্থ উপার্জনে সে ব্যস্ত হবে না। উপার্জনকারী জীবিকা উপার্জনের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় ও নৈতিক গুণাবলিও অর্জন করবে। ব্যক্তিগত আয়-উপার্জনেও কিছু বিধি-নিষেধ আছে। যেন সামষ্টিক জীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি না হয়। আর্থিক জীবনের পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় ইসলাম দুটি শব্দ ব্যবহার করেছে—‘হালাল’ (বৈধ) ও ‘তাইয়িব’ (উত্তম)। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মানুষ, পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু আছে তা থেকে তোমরা আহার কোরো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৬৮)

কোরআনের ব্যাখ্যাকাররা বলেন, ‘হালাল’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো অবৈধ ও ক্ষতিকর নয়—এমন বস্তু ও পদ্ধতি এবং ‘তাইয়িব’ দ্বারা উদ্দেশ্য যা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য উপকারী। সুতরাং ব্যক্তি অর্থ উপার্জনের জন্য এমন কোনো কাজ করতে পারবে না, যা তার নিজের ও অন্যের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সামাজিক জীবনে কুপ্রভাব ফেলে, সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং যা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলাবিরোধী। বরং সে জীবন-জীবিকার এমন সব পথ বেছে নেবে, যা তারা সে নিজে, তার সমাজ ও রাষ্ট্র উপকৃত হবে। আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা ন্যায়সংগতভাবে পরিমাপ ও ওজন কোরো, মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিয়ো না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়িয়ো না।’ (সুরা হুদ, আয়াত : ৮৫)

৩. অর্থ ব্যয়ের মূলনীতি : অর্থ ব্যয়ে ইসলাম মানুষকে সংযমী, বাস্তববাদী, মধ্যপন্থী ও উদার হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। মুমিন প্রয়োজনে উদারতার সঙ্গে ব্যয় করবে এবং প্রয়োজন না হলে সংযত হবে। অপচয় ও অপব্যয় থেকে বেঁচে থাকবে। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান কোরো; অপচয় কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে ভালোবাসেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি তোমার হাত তোমার গ্রীবায় আবদ্ধ করে রেখো না এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিতও কোরো না, তা হলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৯)

৪. কোথায় ব্যয় করবে : ইসলামী বিধান মতে ব্যক্তি তার নিজের, পরিবারের, বৃদ্ধ মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে অসহায় ব্যক্তিদের, সমাজের নিঃস্ব ব্যক্তির ব্যাপারে দায়িত্বশীল। সুতরাং সে সম্পদ পুঞ্জীভূত করে না রেখে মানবকল্যাণে তা ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছে। একদিকে কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘মানুষ কী ব্যয় করবে—সে সম্পর্কে আপনাকে প্রশ্ন করে। বলুন! যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় করবে তা মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন এবং মুসাফিরদের জন্য। উত্তম কাজে যা কিছু তোমরা করো না কেন আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২১৫)

অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমার ওপর আছে তোমার প্রতিপালকের অধিকার, তোমার নিজের অধিকার, তোমার পরিবারের অধিকার। সুতরাং প্রত্যেককে তার অধিকার বুঝিয়ে দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৬৮)

আত্মসমর্পণই চূড়ান্ত কথা : অন্যসব কিছুর একজন মুমিনের জীবন-জীবিকা আল্লাহর হাতে সমর্পিত থাকে। কেননা সে জানে, ‘তারা কি তোমার প্রতিপালকের করুণা বণ্টন করে? আমিই তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করি, পার্থিব জীবনে এবং একজনকে অপরের ওপর মর্যাদায় উন্নত করি, যাতে একে অপরের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে।’ (সুরা জুখরুফ, আয়াত : ৩২)

কিউএনবি/রেশমা/১৩ই অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ/দুপুর ১:৪৬

↓↓↓ফেসবুক শেয়ার করুন